‘অর্থের অভাবে সাধারণের মানুষের ঈদ আনন্দ মাটি”

নিউজ মিডিয়া ২৪: কামরুল হাসান রনি :ঢাকা: দেশে সাধারণ মানুষের পকেটে টাকা নেই। ব্যাংকেও অর্থ সংকট। যারা চাকরিজীবী তারাও অনেকে এখনো বেতন-বোনাস পাননি। তাই ঈদবাজারে আগের মতো ভিড় নেই। যার বড় প্রভাব দেখা গেছে রাজধানীর দর্জির দোকানগুলোতে। অন্য সময় ১০ রোজার মধ্যে দর্জির দোকানগুলোতে কাজের অর্ডার নেওয়া বন্ধ করে দেওয়া হলেও এবার ১৯ রমজান পর্যন্ত কাজের কাঙ্ক্ষিত অর্ডার পাননি দর্জিরা। শুধু দর্জির দোকানই নয়। রেডিমেট বা তৈরি পোশাকের দোকানসহ পুরো ঈদবাজারে অন্য বছরের তুলনায় ভিড় কম। বেচা-কেনাও হচ্ছে না আগের মতো। ব্যবসায়ীদের মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে। এদিকে টাকার অভাবে কেনাকাটা করতে না পারায় সাধারণ মানুষের ঈদ আনন্দই পুরাপুরি মাটি হতে চলেছে।

এর পেছনে বেশ কিছু কারণ জানা গেছে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, বেশির ভাগ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান অর্থসংকটে রয়েছে। আগের মতো ব্যবসা-বাণিজ্য না থাকায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সময় মতো বেতন-ভাতা ও ঈদ বোনাস দিতে পারছে না। তাই বেসরকারি চাকরিজীবীরা পরিবারের জন্য ঈদের কেনাকাটাও করতে পারছেন না। এমনকি অনেক প্রতিষ্ঠানে চাকরিজীবীদের দুই-তিন মাস পর্যন্ত বা তারও বেশি বেতন বাকি। ধার-দেনা করে চলছেন তারা। ঈদের আগে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে বেতন-বোনাস পাওয়ার আশাও ছেড়ে দিয়েছেন কর্মীরা। সেই পরিবারগুলোতে আনন্দের পরিবর্তে হতাশা ও কষ্ট বয়ে আনছে এবারের ঈদ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এমন হতাশা ও কষ্টের কথা জানিয়েছেন অনেকে। এমনকি পরিবারের ছোট সদস্যদের জন্যও ঈদে নতুন পোশাক কেনা হবে বলে কষ্টের সঙ্গে আর্থিক দুরাবস্থার কথা জানিয়েছেন কেউ কেউ।

তাদেরই একজন জামাল উদ্দিন (ছদ্মনাম)। একটি প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। ৪ বছর ধরে একই প্রতিষ্ঠানে আছেন তিনি। বেতন যা পান তা দিয়ে কষ্ট করে ৫ সদস্যের সংসার চালান। আজ মঙ্গলবার পবিত্র রমজানের ১৯তম দিন। জুন মাসের ৫ তারিখ যাচ্ছে। এখনো মে মাসের বেতন পাননি। বোনাসের আশাই ছেড়ে দিয়েছেন। ঈদের কোনো কেনাকাটা এ পর্যন্ত তিনি করতে পারেননি। বেতন যা পান তা দিয়ে ঈদে নতুন পোশাক কিনলে সারা মাস না খেয়ে থাকতে হবে জামালের পরিবারকে। তাই এ ঈদে তার পরিবারের সদস্যরা নতুন পোশাকের চিন্তাই ছেড়ে দিয়েছেন। এ অবস্থা শুধু জামাল উদ্দিনের একার নয়। ওই প্রতিষ্ঠানের অন্য কর্মীদেরও একই অবস্থা। এভাবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আরও অনেকে একই ধরনের সমস্যার কথা জানিয়েছেন।

এদিকে ব্যাংকে তারল্য সংকটের কারণেও এর প্রভাব পড়েছে ঈদবাজারে। বিদেশ থেকে রেমিট্যান্স না আসা, বেকারত্ব বেড়ে যাওয়াসহ নানা কারণে সাধারণ মানুষের পকেটে টাকা নেই। তাই ঈদুল ফিতরে নতুন পোশাকের যে ঐতিহ্য দেশে যুগ যুগ ধরে চলে আসছে তা অর্থের অভাবে অনেকের জন্য এবার ফিকে হয়ে যাচ্ছে। দেশের বড় জনগোষ্ঠী- নিম্ন মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোতে এর প্রভাব পড়েছে।

অপরদিকে, বর্তমান সরকারের সুবিধাভোগী গোষ্ঠী ও উচ্চবিত্ত পরিবারের লোকজন দেশে কেনাকাটা না করে ভারতসহ বিদেশে শপিং করতে দেশ ছেড়েছেন। এর মাধ্যমে দেশের টাকা যেমন বিদেশে চলে যাচ্ছে সেই সাথে অনেকে এই সুযোগে অর্থপাচারেও মেতেছেন। দেশ থেকে এভাবে অর্থ বিদেশে চলে যাওয়ার কারণে দেশের অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়ছে। ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকটের পেছনে লুটপাটের পাশাপাশি এটিও অন্যতম কারণ বলে জানা গেছে। বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশে ঈদবাজারেও যার প্রভাব এখন স্পষ্ট।

কাজ কম, মুখ ভার দর্জিদের
ঈদকে কেন্দ্র করে দর্জির দোকানগুলো বরাবরই সরগরম থাকে। তবে এবার কিছুটা ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে রাজধানীর দর্জির দোকানগুলোতে। রোজার অর্ধেক পেরিয়ে গেলেও প্রত্যাশানুযায়ী কাজ না পাওয়ার কথা জানিয়েছেন দর্জিরা। রোজার ১৮তম দিনে সোমবার রাজধানীর নিউ মার্কেট, গাউসিয়া, চাঁদনি চক, ফার্মগেইট ও মিরপুরের বিভিন্ন দর্জিবাড়ি ঘুরে ব্যস্ততা চোখে পড়লেও কাজ কম পাওয়ার হতাশা ছিল প্রায় সবখানেই। এসব মার্কেটে সাধারণ দোকানগুলোতেও তুলনামূলক ভিড় কম লক্ষ্য করা গেছে।

এদিকে দর্জিরা জানিয়েছেন, অন্যান্য বার ঈদে কাজের বাড়তি চাপ থাকায় ১০ রোজার পরে কাপড়ের অর্ডার না নিলেও এবার তেমন কাজের চাপ না থাকায় এখনও অর্ডার নিচ্ছেন তারা। কাজ কম পাওয়ার পেছনে চাকরিজীবীদের দেরিতে বেতন ও বোনাস পাওয়াকেই মূল কারণ মনে করছেন তারা।

রোজার অর্ধেক পার হয়ে গেলেও গাউসিয়া মার্কেটের পাশের ইসমাইল ম্যানশনের তৃতীয় তলায় দুই-একটি ছাড়া সব দর্জি দোকানেই ক্রেতা আসামাত্র অর্ডার নিতে দেখা গেছে। এখানকার লাভলী টেইলার্সের কাটিং মাস্টার সাইফউদ্দিন জানান, গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার ঈদে কম কাজ পেয়েছেন তারা। “অন্যান্য বার এই সময়ে তো আমাদের দম ফেলার সময় থাকে না। আর এইবার কাজ কম পাওয়ায় এখনও অর্ডার নিচ্ছে।”
স্কয়ার লেডিস ফ্যাশন টেইলার্সের কর্ণধার মো. খুরশেদ আলম ১২ বছর ধরে দর্জির কাজ করেন। ১৫ রোজা পর বেতন ও বোনাস পাওয়ায় কাজ কম এসেছে বলে মনে করেন তিনি। “রোজার ১৮ তারিখ আজ। কিন্তু মানুষের হাতে তো টাকা আসে মাসের ১ থেকে ৫ তারিখে। এই জন্যই এবার ব্যবসা খারাপ। আবার গর্জিয়াস ড্রেসগুলা রেডিমেডই বেশি পাওয়া যায়। তাই রেডেমেড কিনা নিতাছে।”

তবে দর্জিপাড়ায় কাজ কমে যাওয়ার জন্য পোশাক তৈরিতে বেশি মজুরি নেওয়াকেও দায়ী করছেন ক্রেতারা।

এদিকে নয়াপল্টনের পলওয়েল মার্কেটের এক দোকানি বলেছেন, প্রতি বছর রমজানে আমাদের যে পরিমাণ বেচা-বিক্রি হয় সেই তুলনায় এবারের অবস্থা খুবই খারাপ। কারণ, হিসেবে সাধারণ মানুষের পকেটে টাকা না থাকা, মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়া, সেই তুলনায় আয় না বাড়া, উচ্চবিত্ত পরিবারগুলো ঈদের কেনাকাটার জন্য বিদেশে যাওয়াকে উল্লেখ করেছেন ওই ব্যবসায়ী।

ওই ব্যবসায়ী বলেন, আমদানি পণ্যে অতিমাত্রায় শুল্ক আরোপের কারণে একটি পণ্য দেশি বাজারে আসতে দাম প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে যায়। তাই যারা বিদেশি পণ্য ইউজ করেন তাদের অনেকেই এখন আর দেশের বাজারে আসেন না। শপিংয়ের জন্য ঈদের আগে বিদেশ চলে যান। ভ্রমণ করে আসেন, কেনাকাটাও সারেন বিদেশে। আর এর মাধ্যমে দেশের বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে বলেও অভিজ্ঞ ওই ব্যবসায়ী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *