নির্বাচনের নতুন স্টাইল দেখালো গাজীপুর

নিউজ মিডিয়া ২৪: ঢাকা: ‘আওয়ামী লীগের বদনাম হয় এমন কোনো কাজ করা যাবে না। কেন্দ্রের নির্দেশ সবাইকে মেনে চলতে হবে।’ গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের তিনদিন আগে সরকারের পক্ষ থেকে এমন নির্দেশনা দেওয়া হলেও কেউ মানলেন না সেই নির্দেশ। প্রকাশ্যেই কেন্দ্র দখল করে ব্যালট পেপারে সিল মারার ‘মহাকর্মযজ্ঞ’ দেখালেন সরকার দলীয় গাজীপুরের স্থানীয় নেতাকর্মীরা। যা গত মাসের ১৫ তারিখে খুলনায় অনুষ্ঠিত বর্তমান নির্বাচন কমিশনের (ইসি) অধীন সবচেয়ে বিতর্কিত নির্বাচনকেও হার মানিয়েছে বলে কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন। তারা বলছেন, নির্বাচনের নতুন স্টাইল দেখালো গাজীপুর। এমন নির্বাচন কেউ আগে কল্পনাও করতে পারেননি। নৌকায় সিল মারা ব্যালট পেপার ভোটারদের সরবরাহ আবার মেয়রপ্রার্থীর ব্যালট পেপার না দিয়ে শুধু কাউন্সিল প্রার্থীদের ব্যালট পেপার সরবরাহের ঘটনাও ঘটেছে গাজীপুরে। এছাড়া জালভোটের অভিনব সব কৌশল প্রয়োগ হয়েছে গাজীপুর সিটি নির্বাচনে। ফলে দেশবাসীর কাছে এখন নতুন আলোচনার নাম হয়েছে গাজীপুর।
এদিকে অনেকের প্রত্যাশা ছিল, জাতীয় নির্বাচনের আগে খুলনার পর গাজীপুরে অন্তত মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াবে ইসি। কিন্তু হয়েছে ঠিক উল্টো। আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য রাজনৈতিক দলগুলো বলছে, খুলনায় যা হয়েছিল কিছুটা আড়ালে-আবডালে। গাজীপুরে তা নগ্নতার চরম বহিঃপ্রকাশ দেখেছেন দেশবাসী। গাজীপুরে ‘ভোট ডাকাতির’ নতুন কৌশল প্রয়োগের অভিযোগ তুলে তা ‘ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যানের’ পাশাপাশি নতুন করে ভোটের আয়োজন করার দাবি করেছে বিএনপি। তবে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ইসিকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন গাজীপুরে ‘সুন্দর ভোট উপহার’ দেওয়ার জন্য। একইভাবে জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জয়ের ধারা অব্যাহত থাকার আশাও ওবায়দুল কাদেরের।
অনিয়মের ‘লেটেস্ট মডেল’ গাজীপুর
খুলনার মতো গাজীপুর সিটি করপোরেশন (গাসিক) নির্বাচন দৃশ্যত শান্তিপূর্ণ হলেও অন্তরালে অনিয়ম ও জাল-জালিয়াতি হয়েছে সীমাহীন। অনেকে বলেছেন, গাজীপুরে জালিয়াতির স্টাইল খুলনাকে হার মানিয়ে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। শুরুর দিকে ভোটগ্রহণ স্বাভাবিক মনে হলেও বেলা বাড়ার সাথে সাথে পাল্টে যায় দৃশ্যপট। মঙ্গলবার দুপুরের পর থেকে প্রায় প্রতিটি ভোটকেন্দ্র থেকেই আসতে থাকে অনিয়মের নানা খবর। ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীর সমর্থকেরা জালভোট দিতে এলে তাদের নিবৃত্ত না করে সহযোগীর ভূমিকা পালন করে ভোটকেন্দ্রের কর্মকর্তা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। তাদের যোগসাজশে কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া হয়েছে ধানের শীষের প্রার্থীর এজেন্টদের। কোনো কোনো কেন্দ্রে ধানের শীষের এজেন্টরা ঢুকতেই পারেনি। কেন্দ্রের গেট থেকে ‘সাদা পোশাকধারীরা’ তাদের ধরে নিয়ে গেছে বলেও অভিযোগ মিলেছে।
আধঘণ্টাও কেন্দ্রে টিকতে পারেননি ধানের শীষের এজেন্ট: গাজীপুর সিটি নির্বাচনে কোনো কেন্দ্রে আধঘণ্টাও টিকতে পারেননি বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকারের পোলিং এজেন্টরা। সকাল ৮টায় শুরু হওয়া নির্বাচনে কোনো কোনো কেন্দ্রে ১০ থেকে ২০ মিনিট করে বসতে পারলে পরে তাদের বের করে দেয়া হয়। গতকাল সারাদিন নির্বাচনী কেন্দ্রগুলো ঘুরে এ চিত্রই লক্ষ্য করা গেছে।
এদিকে বেলা বাড়ার সাথে সাথে আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়র প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলমের সমর্থকরা কেন্দ্রের ভেতরে অবস্থান নিয়ে দখলে নেয়া শুরু করে। একই সঙ্গে পোলিং এজেন্ট ও ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শনও করা হয়। গাজীপুর কোনাবাড়ীর বিভিন্ন কেন্দ্রে সরজমিন দেখা যায়, এই এলাকার একটি কেন্দ্রেও ভোটকক্ষে ধানের শীষের কোনো পোলিং এজেন্ট ছিলেন না। জরুন হাফিজিয়া মাদরাসা কেন্দ্রে দেখা যায় নৌকা প্রতীকের ব্যাজ ধারণ করে ভোট কক্ষগুলোতে বসে আছেন এজেন্টরা।
নারীকেন্দ্রে পুরুষ ভোটার : বাইরে দৃশ্যত শান্তিপূর্ণ পরিবেশ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতাও লক্ষণীয়। কিছুক্ষণ পরপর এদিক-ওদিক ছুটে যাচ্ছে র‌্যাব-পুলিশ ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের গাড়ি। কিছু কিছু কেন্দ্রের বাইরে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রার্থীর নির্বাচনী ক্যাম্প পাশাপাশি। সকালের দিকে প্রায় সব কেন্দ্রে এ রকম দৃশ্যই দেখা গেছে। এ সময় বেশির ভাগ কেন্দ্রেই উপস্থিত ছিলেন সকল প্রার্থীর এজেন্ট। সবমিলিয়ে গাজীপুর সিটিতে সকালে ছিল উৎসব ভাব। কিন্তু প্রতিটি কেন্দ্রের মুখে সকাল থেকেই অবস্থান নেয় নৌকা প্রতীকের ব্যাজধারী ক্ষমতাসীন দলের লোকজন। যাদের বেশির ভাগই তরুণ-যুবক। তারা হৈ-হুল্লোড় করছেন, ভোটারদের দাঁড় করিয়ে হাতে ধরিয়ে দিচ্ছেন নৌকা প্রতীকের ভোটার স্লিপ। নৌকার ব্যাজ ঝুলিয়ে দিয়েছেন গলায়। ক্ষমতাসীন দলের কর্মী-সমর্থকদের এমন অবস্থানের কারণে ভয়ে কেন্দ্রে যেতে পারেনি এলাকায় বিএনপির চিহ্নিত কর্মী-সমর্থকরা। কেন্দ্রের মুখে এমন সরব মহড়ার মাধ্যমে বিএনপিসহ বিরোধী দলীয় কর্মী-সমর্থকদের ভোটকেন্দ্রে যেতে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হলেও সেসব দেখেও দেখেননি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও নির্বাচনী কর্মকর্তারা। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাল্টে যেতে থাকে গাজীপুর সিটি নির্বাচনের পরিস্থিতি। বের করে দেয়া হয় ধানের শীষের এজেন্ট। মিডিয়ার উপস্থিতিতে প্রশাসনের নীরব সহায়তায় প্রকাশ্যে সিল মারা হয় নৌকা প্রতীকে। বিএনপির তরফে গাজীপুর সিটি নির্বাচনে প্রতি কেন্দ্রে দুইজন করে বিকল্প এজেন্ট রাখার কথা বলা হলেও বাস্তবতা দেখা গেছে ভিন্ন। সকাল ১০টার পর ৮০ ভাগ কেন্দ্রেই বিএনপি প্রার্থীর কোনো এজেন্ট দেখা যায়নি। আর প্রতিটি কেন্দ্রেই জালভোটের ব্যাপারে প্রিজাইডিং কর্মকর্তাদের উত্তর শোনা গেছে একই- আমি কিছু জানি না, কেউ কোনো অভিযোগ করেনি। গাজীপুর সিটি নির্বাচনে টঙ্গী, গাছা, কোনাবাড়ি, কাশিমপুর, বাসন, চান্দনা, জয়দেবপুর, সদর ও পুবাইলের অন্তত ৪০টি কেন্দ্রে সরজমিন ঘুরে এমন দৃশ্য দেখা গেছে।
দুপুর তখন সাড়ে ১২টা। ৩৭ নম্বর ওয়ার্ডের গাছার বড়বাড়ি এলাকার মির্জা ইবরাহিম মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয়ে দুইটি মহিলা ভোটকেন্দ্র। কেন্দ্রের বাইরে সরকার সমর্থকদের মহড়া থাকলেও পরিবেশ শান্তিপূর্ণ। স্কুল মাঠের উত্তরপ্রান্তের ভবনে ২৪৬ নং কেন্দ্র। প্রিজাইডিং কর্মকর্তার আধবোজা দরোজায় দাঁড়িয়ে আছেন কয়েকজন। ঠিক পাশের কক্ষে উঁকি দিতেই দেখা গেল, ভেতরে পঞ্চাশোর্ধ একজন প্রকাশ্যেই নৌকা প্রতীকে সিল মেরে বাক্সে ভরছেন ব্যালটগুলো। কোনো তাড়াহুড়ো নেই, একেবারে স্বাভাবিকভাবে। পরিচয় জানালেন, তার নাম আবদুর রহমান। তিনি আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী সাইফুল ইসলাম দুলালের পোলিং এজেন্ট। কাউন্সিলর প্রার্থীর এজেন্ট হয়েও মেয়র প্রার্থীর পক্ষে ভোট মারছেন কেনো? উত্তরে জানালেন, দুই প্রার্থী একই দলের। তাই জাহাঙ্গীর আলমের হয়েও কাজ করছেন। স্বীকার করলেন, কাজটি ‘ভুল’ হয়েছে।
আড়াই ঘণ্টায় ব্যালট শেষ : ভোটগ্রহণ শুরুর মাত্র আড়াই ঘণ্টার মধ্যেই শেষ হয়ে যায় গাসিক ১৭নং ওয়ার্ডের মুগর খাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রের ব্যালট পেপার। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকাল সাড়ে ১০টায় কেন্দ্রটি দখলে নেয় আওয়ামী লীগ মেয়র প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলমের নৌকা মার্কার লোকজন। ভোটগ্রহণের কিছু সময় পরেই ওই কেন্দ্র থেকে বিএনপির এজেন্টদের বের করে দেন নৌকা প্রতীকের কর্মীরা। পরে তারা ব্যালট নিয়ে নৌকা মার্কায় সিল মারেন। এ বিষয়ে কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার জহুরুল ইসলাম জানান, ভোটকেন্দ্রে আবার নতুন ব্যালট পেপার এনে ভোট নেয়া শুরু হয়েছে। কিছু সময় ভোটগ্রহণ থেমে ছিল।
ভোটকেন্দ্রের গেটে তালা দিয়ে নৌকায় সিল : দুপুর সাড়ে ১২টায় ৩৭ নম্বর ওয়ার্ডের মির্জা ইব্রাহীম মেমোরিয়াল উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে এক যুবককে ৮টা ব্যালট হাতে ভোট দিতে দেখা যায়। এ সময় সাংবাদিকরা তার হাতে এতগুলো ব্যালট কেন জানতে চাইলে ওই যুবক বলেন, বয়স্ক মানুষকে সাহায্য করছেন। এরপর পেছন থেকে সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার এসে সাংবাদিকদের প্রিজাইডিং কর্মকর্তার কক্ষে নিয়ে যান। সাথে ছিলেন পুলিশের এসআই আসিফ। প্রিজাইডিং অফিসার হারুন উর রশীদ সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পর বলেন, ‘এ কেন্দ্রে সকাল থেকে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। সুষ্ঠুভাবে ভোটগ্রহণ চলছে।’ সাংবাদিকরা ওই যুবকের কথা উল্লেখ করলে তিনি বলেন, ‘মাত্র অভিযোগটি পেলাম। আর কোনো অভিযোগ পাইনি।’
১২টা ৪০ মিনিটে কেন্দ্রের বাইরে কৃত্রিম গোলযোগ সৃষ্টি করে আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়রের সমর্থকেরা। এ সময় ভোটারদের বের করে দিয়ে পুলিশ বিদ্যালয়ের গেটে তালা লাগিয়ে দেয়। বাইরে থেকে বিএনপির কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকেরা গেটে ধাক্কা দিতে থাকে। পুলিশ অস্ত্র উঁচিয়ে তাদের সরে যেতে বলে। ঘটনার সময় কেন্দ্রের বুথগুলো থেকে নৌকার ব্যাজধারী প্রায় অর্ধশত যুবক বের হয়ে আসে। এরপর এসআই আসিফের মোবাইল নিয়ে এসে প্রিজাইডিং অফিসারকে কথা বলতে বলেন। প্রিজাইডিং অফিসার মোবাইলের অপর পাশে থাকা ব্যক্তিকে জানান, তার কেন্দ্রে ভোট রয়েছে ৩ হাজার ৪০০। সকাল থেকে ভোট দিয়েছেন ৯৪৪ জন। তখন মোবাইলের অপর প্রান্ত থেকে ১২০০ ভোট কাস্ট করার কথা জানানো হয় প্রিজাইডিং অফিসারকে। পরে ওই কক্ষে নৌকার ব্যাজধারী চল্লিশোর্ধ্ব এক ব্যক্তি প্রবেশ করে বলেন, ‘মেয়র সাহেব বলেছেন, এটা নিয়ে নাও। এ ঘোষণায় বুথগুলো থেকে বেরিয়ে আসা পুরুষেরা আবার বুথে ফিরে যান এবং জালভোট দিতে থাকেন। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে প্রিজাইডিং অফিসার বলেন, ‘ভোটাররা ভোট দিচ্ছেন। কোনো জালভোট হচ্ছে না।’ এ দিকে এ কেন্দ্রে ঝামেলার সময় পাশের পুরুষ কেন্দ্র মাহিরা উচ্চবিদ্যালয়ও দখলে নেয় আওয়ামী লীগ সমর্থকেরা।
নৌকায় সিল মারা ব্যালট সরবরাহ : ৩৭ নম্বর ওয়ার্ডের মির্জা ইব্রাহীম মেমোরিয়াল স্কুল ভোটকেন্দ্রের একটি বুথে ভোট শুরুর আগেই নৌকার সমর্থকেরা ব্যালটের একটি বইয়ে নৌকা প্রতীকে সিল মেরে রাখে। পরে ভোটাররা ভোট দিতে এলে তাদের সিল মারা ব্যালট দেয়া হয়। দুপুর ১২টায় ওই কেন্দ্রের একটি বুথে ভোট দিতে ঢুকেন এক তরুণী। তিনি জানান, তাকে দুই কাউন্সিলর প্রার্থীর ব্যালট পেপার দেওয়া হয়। মেয়র প্রার্থীর ব্যালট নিতে গেলে সেখানে থাকা কয়েকজন জানায়, ‘মেয়রের ভোট দেওয়া লাগবে না। এ ভোট তারা নিজেরাই দিয়ে দিচ্ছে।’ একই ওয়ার্ডে পাশের হাজী আবদুল লতিফ প্রাথমিক বিদ্যালয়েও একই অবস্থা দেখা গেছে। বেলা দেড়টায় জানা যায়, এ কেন্দ্রটিতে নৌকার পাশাপাশি কাউন্সিলর প্রার্থীর প্রতীক ঠেলাগাড়িতেও সিল মারা রয়েছে।
নৌকায় সিলের প্রতিবাদে বিক্ষোভ: শহীদ স্মৃতি উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকেরা জোর করে ব্যালট ছিনিয়ে নিয়ে সিল মারে। এ ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে কেন্দ্রের সামনে বিক্ষোভ করে বিএনপি-সমর্থক কাউন্সিলর প্রার্থী হান্নান মিয়া হান্নুর সমর্থকেরা। এ সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে তাদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়। ওই কেন্দ্রের ২০১ নম্বর বুথের ভোটার মীর মোহাম্মদ মোফাজ্জল (৩৩০৬৩৪১৮৭৭৮৬) বলেন, ‘আমি বুথে প্রবেশ করার পরে ৭-৮ জন লোক এসে আমার কাছ থেকে ব্যালট ছিনিয়ে নেয়। এ সময় তারা বুথে থাকা অন্য ব্যালট নিয়ে নৌকা প্রতীকে সিল মারতে থাকে।’ ওই কেন্দ্রের ৬টি বুথে বিএনপির কোনো এজেন্ট পাওয়া যায়নি।
সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে ২০৩ নম্বর কে গিয়ে দেখা যায়, সেখানেও মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীর ব্যালট শেষ। তবে নারী কাউন্সিলরের ব্যালট শেষ হয় ৮১টা। ওই বুথের সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার জানান, তাদের চার পাশ ঘিরে ধরে আধঘণ্টায় ভোট কেটে নেওয়া হয়। পাশের বুথ ২০৫ নম্বরেও একই ঘটনা ঘটে। এই বুথে আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীর এজেন্ট শাহীন রেজা নিজেও তার প্রার্থীর পক্ষে ব্যালটে সিল মারেন। সামনাসামনি এ অভিযোগ করেন নৌকার এজেন্ট মো: মিজানুর রহমান লিটন এবং অপর কাউন্সিলর প্রার্থীর এজেন্ট আব্দুল করিম। ২০৬ নম্বর বুথে দেখা গেছে, মেয়র প্রার্থীর ব্যালট ১০৬টা ব্যবহার হলেও কাউন্সিলর ও নারী কাউন্সিলর প্রার্থীর ব্যালট গেছে ৯১টি। এবিষয়ে প্রিজাইডিং অফিসার সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘সহকারী প্রিজাইডিং অফিসারের কাছ থেকে সমস্যা জেনে নিচ্ছি। কিছু লোক জাল ভোট দিতে এসেছিল, পোলিং এজেন্টরা তাদের চিহ্নিত করার পর একটু সমস্যা হয়েছে। আমরা ব্যবস্থা নেবো।’
একই ঘটনা জয়দেবপুর ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের মদিনাতুল উলুম সিনিয়র মাদরাসা কেন্দ্রেও। জোর করে ঢুকে নৌকার পে সিল মারে ২০ থেকে ৩০ জন যুবক। এ ঘটনায় সেখানে আধ ঘণ্টার মতো ভোটগ্রহণ বন্ধ ছিল।

ধানের শীষের এজেন্টদের কার্ড ছিনতাই : গাজীপুর সিটিতে বেশির ভাগ কেন্দ্রে বিএনপির এজেন্ট ছিল না। ভোট শুরুর দিকে কিছু কেন্দ্রে এজেন্ট ছিল। তবে মঙ্গলবার সকাল ১০টার পর তাদের বের করে দেয়া হয়। ধানের শীষের এজেন্টদের কার্ড ছিনিয়ে নেয় নৌকা সমর্থকেরা। কেন্দ্রের বাইরেও বিএনপি নেতাকর্মীদের থাকতে দেয়া হয়নি। কেন্দ্রের বাইরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাহারায় সরকার দলীয় প্রার্থীর সমর্থকদের মহড়া ছিল দিনভর। ভোটের দিন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে নীলেরপাড়া উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, ভেতরে বিএনপির কোনো এজেন্ট নেই। বাইরে ধানের শীষের ব্যাজ পরা কয়েকজনকে দেখা যায়। তারা অভিযোগ করেন, ভোট শুরুর পর পুলিশ এসে তাদের চলে যেতে বলেছে। বিএনপির এজেন্ট শূন্য ওই কেন্দ্রে ভোটের হারও ছিল অস্বাভাবিক। সেখানে প্রথম এক ঘণ্টায় ছয়টি বুথে প্রায় ৭০০ ভোট পড়ে। ওই কেন্দ্রে ভোটার ২৩২৭। কেন্দ্রের দায়িত্বরত প্রিজাইডিং অফিসার সুমন কুমার বসাক দাবি করেন, ধানের শীষের এজেন্টরা এসেছিল। তবে তারা কেন চলে গেলেন তা তিনি জানেন না।
আওয়ামী লীগের মেয়রপ্রার্থী জাহাঙ্গীর আলমের নিজ কেন্দ্র কানাইয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও ধানের শীষের কোনো এজেন্ট ছিল না। ওই কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার তানজুরুল ইসলামের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, বিএনপির এজেন্ট ঢুকতে পারছে না- এমন কোনো অভিযোগ তিনি পাননি।
৯ কেন্দ্রের ভোট স্থগিত : ৪২৫টি ভোটকেন্দ্রের অধিকাংশ কেন্দ্রেই ব্যালট পেপার ছিনতাই, জালভোট, কেন্দ্র দখল, বিরোধী পক্ষের এজেন্টদের ভোটকেন্দ্রে ঢুকতে না দেওয়া, জোর করে কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া, ধানের শীষের ব্যাচ ছিনতাই করে নৌকার লোক বিএনপির এজেন্ট সেজে বসে থাকা এবং বিএনপির নির্বাচনী কেন্দ্র পর্যন্ত দখল করে নেওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। তবে এর মধ্যে জালিয়াতির ঘটনায় মাত্র ৯টি কেন্দ্রের ভোট স্থগিত করা হয়। স্থগিত হওয়া কেন্দ্রগুলো হচ্ছেÑ খরতৈল মনসুর আলী আদর্শ বিদ্যালয় কেন্দ্র-১ (নং-৩৭২), খরতৈল মনসুর আলী আদর্শ বিদ্যালয় কেন্দ্র-২ (নং ৩৭৩), হাজী পিয়ার আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র (নং-৩৮১), জাহান পাবলিক দত্তপাড়া টঙ্গী কেন্দ্র (নং-৩৪২), ভোগড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র (নং-৯৮), কুনিয়া হাজী আব্দুল লতিফ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র-১ (নং-২৪৩), কুনিয়া হাজী আব্দুল লতিফ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র-২ (নং-২৪৪), মেশিন টুলস উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্র-২ (নং-১৬১) এবং বিন্দান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও পূবাইল কেন্দ্র (নং ২৭৪)।
এ প্রসঙ্গে সহকারী রিটার্নিং অফিসার তারিফুজ্জামান জানান, কেন্দ্রগুলোর সংশ্লিষ্ট প্রিজাইডিং অফিসার ইসির সাথে পরামর্শ করে বিধি মোতাবেক ভোট গ্রহণ স্থগিত করে রিটার্নিং অফিসারের কাছে তালিকা পাঠিয়েছেন। এসব কেন্দ্রে ভোটারসংখ্যা ২৩ হাজার ৯৩৫ জন।
খুলনা টু গাজীপুর
খুলনা টু গাজীপুর। দুইশ’ কিলোমিটারের বেশি দূরত্ব দুই সিটির। খুলনায় ভোট হয়েছিল ১৫ই মে। এর ৪০ দিন পর ভোট গাজীপুরে। তবে দুই সিটির ভোটে দারুণ মিল দেখা গেছে ২৬ জুন, মঙ্গলবার। ব্যালট ছিনতাই, জাল ভোটের উৎসব আর কেন্দ্র দখলে রেখে পছন্দের প্রার্থীর পক্ষে ভোট দেয়ার চিত্র দেখা গেছে দিনভর। খুলনার মতোই এখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ভূমিকা পালন করতে দেখা গেছে। নির্বাচনে অনিয়ম জাল ভোট ঠেকাতে পুলিশকে কোথাও তৎপর না দেখা গেলেও নির্বাচনী খবর সংগ্রহে থাকা সংবাদিকদের নানা অজুহাতে পুলিশ হয়রানি করেছে বিভিন্ন কেন্দ্রে। এমনকি আটক করে রাখার ঘটনাও ঘটেছে। খুলনায় এক নতুন কিছিমের ভোট হয়েছিল। বাইরে দৃশ্যত শান্তিপূর্ণ পরিবেশ থাকলেও কেন্দ্র নিয়ন্ত্রণ করে জাল ভোট দেয়ার অভিযোগ ছিল পুরো নির্বাচনী এলাকায়। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী তালুকদার আবদুল খালেক বিপুল ভোটে বিএনপির প্রার্থীকে পরাজিত করেন। খুলনার মতোই গাজীপুরে দিনভর শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হয়েছে। বড় কোনো সংঘাতের ঘটনা ঘটেনি। তবে সকাল থেকেই বিএনপির প্রার্থী অভিযোগ করতে থাকেন তার এজেন্টদের বের করে দেয়া হয়েছে। কোথাও কোথাও এজেন্টরা কেন্দ্রেই যেতে পারেননি। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এমন কেন্দ্র দখলের সংখ্যাও বাড়তে থাকে। সকালে ভোটার উপস্থিতি কিছুটা থাকলেও দুপুরের পর থেকে তা কমে যায়। কেন্দ্র নিয়ন্ত্রণে নিয়ে জাল ভোট দেয়ার মহাকর্মযজ্ঞ দেখায় সরকার দলীয় লোকজন। তবে বড় ধরনের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই গাজীপুরেও নির্বাচন শেষ হয়েছে।
ভোটের ফলাফল: গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনে ৫৭টি ওয়ার্ডের মোট ৪২৫টি কেন্দ্রের মধ্যে ৪১৬টিতে জাহাঙ্গীর আলম পেয়েছেন ৪ লাখ ১০ ভোট। নির্বাচন কমিশন কর্তৃক ঘোষিত বেসরকারি ফলাফলে বিএনপির হাসান উদ্দিন সরকার পেয়েছেন ১ লাখ ৯৭ হাজার ৬১১ ভোট।
এছাড়া অন্য মেয়রপ্রার্থীদের মধ্যে হাতপাখা প্রতীকে মাওলানা নাসির উদ্দিন পেয়েছেন ২৬ হাজার ৩৮১ ভোট। মিনার প্রতীকধারী ইসলামী ঐক্যজোট মনোনীত মেয়র প্রার্থী মাওলানা ফজলুর রহমান ১ হাজার ৬৫৯ ভোট পেয়েছেন। কমিউনিস্ট পার্টির মেয়র প্রার্থী কাজী রুহুল আমিন কাস্তে প্রতীকে ৯৭৩ ভোট, মোমবাতি প্রতীকের জালাল উদ্দিন ১ হাজার ৮৬০ ভোট ও ঘড়ি প্রতীকের ফরিদ আহমেদ ১ হাজার ৬১৭ ভোট পেয়েছেন। ইসি জানিয়েছে, নির্বাচনে মোট ৫৭ দশমিক ০২ শতাংশ ভোট পড়েছে। এরমধ্যে বৈধ ভোটের সংখ্যা ৬ লাখ ৩০ হাজার ১১১।
অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছে: ইসি
খুলনার মতো গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নির্বাচনও অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে বলে দাবি করেছেন নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সচিব হেলালুদ্দীন আহমেদ। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা জানান। হেলালুদ্দীন আহমেদ বলেছেন, ‘গাজীপুরের নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে। নিজস্ব পর্যবেক্ষক দিয়ে নির্বাচনের পরিবেশ সম্পর্কে আমরা জানতে পেরেছি। আমাদের নির্দেশ ছিল কোনো কেন্দ্রে অনিয়ম হলে তা বরদাশত করা হবে না। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ইসি সচিব বলেন, বিএনপি প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে দুই দফা বৈঠক করেছে। তাদের অভিযোগের ব্যাপারে আমি কোনো কিছু জানি না। জাল ভোটের অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে হেলালুদ্দীন বলেন, এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনে এখন পর্যন্ত কেউ কোনো অভিযোগ করেনি।

‘আ.লীগ জিতেছে গণতন্ত্র হেরেছে’
নির্বাচনে নজিরবিহীন ভোট ডাকাতি হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপির প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকার। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘গাজীপুরবাসী ৮০ বছরের ইতিহাসে এমন ভোট ডাকাতি দেখেনি।’ তিনি বলেন, ‘নির্বাচনে ৪’শর অধিক কেন্দ্রে ভোট জালিয়াতি হয়েছে। আওয়ামী লীগের স্বরূপ উন্মোচন করার জন্যই বিএনপি নির্বাচন বয়কট করেনি। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জিতেছে, গণতন্ত্র হেরেছে।’
বিএনপির এজেন্টদের জোরপূর্বক কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। ভোটাররা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারেনি। এমন ভোট ইতিপূর্বে গাজীপুরবাসী দেখেনি। এমন নির্বাচনের মাধ্যমে কমিশনকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। এর আগে নির্বাচন চলাকালেই ভোট স্থগিতের দাবি করেছিলেন হাসান উদ্দিন সরকার।
আ.লীগ-বিএনপি যা বলছে…
গাজীপুর সিটিতে নির্বাচনের পর এ নিয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় বুধবার সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘গাজীপুরে ভোট ডাকাতির নতুন নতুন কৌশল প্রয়োগ হয়েছে। এই নির্বাচন আমরা ঘৃনাভরে প্রত্যাখ্যান করছি। সেই সাথে নতুন করে গাজীপুর সিটি করপোরেশনে ভোটগ্রহণের দাবি জানাচ্ছি।’

অপরদিকে বুধবার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ‘গাজীপুরে সুন্দর নির্বাচন উপহার দেওয়ার জন্য নির্বাচন কমিশনকে ধন্যবাদ।’ একইভাবে আগামী জাতীয় নির্বাচনেও নৌকার এই জয়ের ধারা অব্যাহত থাকবে বলেও আশা করছেন সরকারের সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *