‘প্রিয় মনিকা, মরে গেলে নতুন কাউকে খুঁজে নিয়ো’

যুদ্ধ-সংঘাতের দামামা বদলে দেয় জীবন। সাজানো সবকিছু মুহূর্তেই তছনছ হয়ে যায়। ভয়-আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তা ঘিরে ধরে। তবে জীবন থেমে থাকে না। থেমে থাকে না প্রেম-ভালোবাসা আর প্রিয়জনের জন্য মমত্বও। কখনো চিঠিতে, কখনোবা ডায়েরির পাতায় মানুষ যুদ্ধ-সংঘাতের দিনগুলোতে নিজেদের ভালোবাসার কথা লিখে রাখে। এমন কিছু চিঠি জোগাড় করেছে সিএনএন। সেখান থেকে তিনটি চিঠি ও লেখকদের প্রেক্ষাপট প্রথম আলোর পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো:

ঘটনা ১: আর্জেন্টিনার বুয়েনস এইরেসে বেড়ে উঠেছেন মারিও গিরালডেজ ও মনিকা। ১৯৭৮ সালে তাঁরা পরস্পরের প্রেমে পড়েন। ভালোই চলছিল দিনগুলো। হঠাৎ সব বদলে গেল। ১৯৮২ সালে ফকল্যান্ড দ্বীপ নিয়ে আর্জেন্টিনা ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে যুদ্ধ বেধে গেল। মারিওকে প্রকৌশল পদাতিক রেজিমেন্টের হয়ে যুদ্ধে যেতে হয়। ১২ এপ্রিল তিনি মনিকাকে বিদায় জানান। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে তিনি ভালোবাসার মানুষ মনিকার কাছে একটি চিঠি পাঠান। ৭৪ দিনের ওই যুদ্ধে ৯০০ জন প্রাণ হারান। বেঁচে ফেরেন মারিও। আনন্দে আত্মহারা হন মনিকা। দুই বছর পর ১৯৮৪ সালের ১৯ জুন তাঁরা বিয়ে করেন। তিন সন্তান আর চার নাতি-নাতনি নিয়ে তাঁদের সুখের সংসার।
প্রিয় মনিকা,
আশা করি তুমি ও তোমার পরিবার ভালো আছ।

আমি এখনো বেঁচে আছি। তবে যেকোনো সময় মরে যেতে পারি। মৃত্যুর আগে তাই বিদায় বলে চিঠি লেখাটা অনেক কষ্টের। কিন্তু মনে হলো, এটার প্রয়োজন আছে।
আমাকে মনে রেখো। ভুল করলে ক্ষমা করে দিয়ো। যতটা ভালোভাবে আমাকে মনে রাখা যায়, রেখো। আমি যখন থাকব না, তখন নতুন কাউকে বেছে নিয়ো। বিয়ে কোরো। আমার জন্য যে ভালোবাসা তুমি জমিয়ে রেখেছিলে, সেটা তাঁকে বেসো।
বলি, তুমি একজন পরিণত পুরুষকে খুঁজে নিয়ো; আমার মতো কোনো বালককে নয়। যে ভালোবাসার স্বাদ আমি তোমার কাছ থেকে পেয়েছি, সেটা তাঁকে দিয়ো।
মায়ের যত্ন নিয়ো। তাঁর প্রতি করা খারাপ আচরণের জন্য আমাকে ক্ষমা করে দিতে বোলো। বাবার যত্ন নিয়ো, ভালোবেসো। তিনি তোমাকে ভালোবাসেন, তোমার ভালোর জন্যই সবকিছু করেন।
বিদায়! মৃত্যুর পর যদি কোনো জীবন থাকে, আমি তোমাকে ভালোবেসে যাব। ঈশ্বরের কৃপায় তুমি তোমার মনের মতো একজনকে খুঁজে পাবে।
—মারিও ই. গিরালডেজ

ঘটনা ২: ২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মেরিন সেনা লে. কার্ল কুরবিকফকে আফগানিস্তানে মোতায়েন করা হয়। বাড়ি রেখে যান তাঁর সন্তানসম্ভবা স্ত্রী লিসা ও ছেলে অ্যালেক্সকে। তাদের নিয়ে সুখে থাকার জন্যই এত দূর যাওয়া। যুদ্ধক্ষেত্রে বসে স্ত্রী-সন্তানদের কথা খুব মনে পড়ত। তখন স্ত্রীকে নিচের চিঠিটি লিখেন। চিঠি পাঠানোর কয়েক দিন পর ভয়াবহ বিস্ফোরণের কবলে পড়েন কার্ল। প্রাণে বেঁচে যান, তবে দৃষ্টি ও শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বহু চিকিৎসার পর এখন তিনি চোখে দেখতে পান। তবে বাঁ কানে এখন আর কিছু শুনতে পান না। প্রচণ্ড মাথাব্যথায় ভুগছেন। তিনি এখনো মেরিন সেনা হিসেবে কর্মরত আছেন। পদোন্নতি পেয়ে ক্যাপ্টেন হয়েছেন।

আমার প্রিয় স্ত্রী,
এখন বিকেল পাঁচটা। সন্ধ্যার সঙ্গে সঙ্গে ঠান্ডা ঝাঁকিয়ে বসতে শুরু করেছে।
একটু আগেই কাজ থেকে ফিরলাম। রাতের খাবার সারলাম। তোমাকে আর অ্যালেক্সকে ভীষণ মিস করি। তবে সবচেয়ে বেশি মিস করি তোমার হাতের রান্না। এখানে এসে আমি বুঝতে পারছি, নিজের বাড়ি আর স্বাধীনতা নিয়ে আমরা কতটা সৌভাগ্যবান।
ঠান্ডা পানি যে এতটা বিলাসিতার, এখানে না এলে বুঝতে পারতাম না। ঠান্ডা পানি এখানে বিলাসিতার চেয়েও বেশি কিছু।
আমি ও আমার সহকর্মীরা প্রতিদিন কষ্ট করছি। ছোট ছোট আত্মত্যাগ করছি। একটাই কারণ, আমরা যেন বাড়ি ফিরে নিজেদের জীবনটা ভালোভাবে কাটাতে পারি। সাত মাস ধরে চরম বিপৎসংকুল পরিবেশে আছি। শুধু তোমাদের নিয়ে একটা সুন্দর জীবন কাটানোর ভবিষ্যৎ ভাবনা থেকে। আমি ভাগ্যবান, তোমার মতো স্ত্রী পেয়েছি যে আমাকে বোঝে ও সহায়তা করে।
যখন নিজের জন্য কিছুটা সময় পাই কিংবা রাতে যখন আমার কিছু করার থাকে না, তখন তোমার, অ্যালেক্স আর মারিশার কথা খুব মনে পড়ে। ভাবি, আমার অসাধারণ একজন স্ত্রী আছে, সুন্দর দুই সন্তান আছে। আমার আর কিছু চাওয়ার নেই। সুখে-শান্তিতে দীর্ঘ সময় কাটানোর জন্য আমার জীবনটা প্রস্তুত।
আমরা আমাদের সন্তানদের অদ্ভুত সুন্দর জীবন দিতে যাচ্ছি। এখান থেকে ফেরার পর আমি তাদের শেখাতে চাই—সুখের সময় উপভোগ করতে হয় আর কখনো হাল ছাড়তে নেই।
কবে তোমার কাছে যাব, সন্তানদের আদর করব, সে অপেক্ষা আর সইছে না। আমি তোমাদের সবাইকে ভীষণ মিস করি। কবে বাড়ি ফিরব, তোমাদের কাছে, সে তর আর সইছে না।
—কার্ল

ঘটনা-৩: ইরাকে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় ২০০৭ সালে স্বামীকে হারান নাহলা। অটিস্টিক ছেলেকে নিয়ে দিশেহারা অবস্থা হয় তাঁর। একাকী বেঁচে থাকার লড়াই করতে করতে তাঁর মনে হয়েছিল, আর কোনো দিন তাঁর জীবনে প্রেম আসবে না। তবে তেমনটা হয়নি। ২০০৯ সালে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার আমন্ত্রণে আরও অনেক নারীর মতো একটি অনুষ্ঠানে গিয়ে প্রথম দর্শনে ভালো লেগে যায় আকিলকে। নানা দ্বিধা-দ্বন্দ্ব কাটিয়ে ২০১৪ সালে তাঁরা বিয়ে করেন। এখন বাগদাদে বেশ সুখেই আছেন তাঁরা।

আমার প্রিয় আকিল,
আমাদের প্রথম দেখার দিনটি তোমার মনে আছে? আমি কালো পোশাকে আমার সাত বছরের ছেলের হাত ধরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। ঘটনাটা ২০০৭ সালের এপ্রিলের। বাগদাদে বোমা হামলায় আমার স্বামী মারা গেলেন। সে সময় আমি আর আমার ছেলে ওসাইদ ছিলাম ভীষণ অসহায়। সেদিন অনেকে মারা যান। হাসপাতালের মর্গে আমি যখন স্বামী লাশটা গ্রহণ করি, তখন সেটা একেবারে পুরে যাওয়া একটি কঙ্কাল।
শুধু এ কারণেই যে আমরা অসহায় ছিলাম, তা নয়। তুমি জানো, আমার ছেলে অটিস্টিক। ওই সময় আমার দেশ ইরাকে গৃহযুদ্ধ চলছে। মনে আছে আকিল, বাগদাদ কী ভয়াবহ সহিংসতার যুগে ঢুকে গেল? সড়কের এখানে-সেখানে পড়ে থাকত মৃতদেহ।
এ সবকিছুর মধ্যে আমি আমার অটিস্টিক সন্তানকে নিয়ে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলাম। আমাদের চারপাশে অনেক স্বজন আর বন্ধু ছিল। তারপরও নিঃসঙ্গ লাগত। মনে হতো, আমরা আমাদের লড়াইয়ে হেরে যাব। সে সময় আশার আলো হয়ে তুমি এলে।
ওই এক ঝলকের দেখায় আমাদের প্রেমের গল্পের শুরু। এরপর বিয়ে। আমরা ভিন্ন পরিবেশ থেকে ওঠে এসেছি, আমরা ভিন্ন প্রজন্মের, আমাদের লড়াইয়ের গল্পগুলো আলাদা। আমরা আমাদের এসব ভিন্নতা আর লড়াইগুলো নিয়ে চিন্তায় ছিলাম।
দিন যেতে থাকল। আমাদের ভালোবাসা একটু একটু করে বাড়তে থাকল। আমরা আমাদের ভিন্নতাগুলোকে মেনে নিলাম। আমাদের লড়াইগুলো কমতে শুরু করল। ছয় বছর পর আমরা নিজেদের মধ্যে মিল খুঁজে পেতে শুরু করলাম। সিদ্ধান্ত নিলাম বিয়ের। তুমি গভীর ভালোবাসায় আমাকে জড়ালে। আবার ভালোবাসার শক্তি দিলে। তুমি ওসাইদের নতুন বাবা হলে, তাকে সাহস দিলে, শিশুকাল থেকে বয়ঃসন্ধিকালে নিয়ে গেলে। তুমি তাঁকে সাঁতার কাটতে ও শেভ করতে শেখালে। তুমি গাড়িতে করে বা হেঁটে হেঁটে তাকে বাগদাদ ঘুরাতে।
তোমার ভালোবাসায় সবগুলো দিন সার্থক হতে থাকল। কিন্তু ভেলেন্টাইন দিবসটা খুবই বিশেষ। আমরা যাদের ভালোবাসি তাদের প্রতি সেই অনুভূতি প্রকাশের সুযোগ করে দেয় এটা। আমি বুঝতে শিখলাম ভালোবাসার শক্তি ব্যক্তি ও তাদের ভালোবাসার গল্পগুলোর চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। সবাই নিজেদের মতো ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। আমাদের ভালোবাসার গল্পটা বহু গল্পের একটি।
কোনো এক ভেলেন্টাইন দিবসে আমি, তুমি আর ওসাইদ মিলে ভালোবাসার চিঠি লিখব—সেই স্বপ্ন দেখি। সেই চিঠি এমন ইরাকের গল্প বলব; যেখানে তরুণ ইরাকিরা যুদ্ধের ক্ষত থেকে ভালোবাসার স্বদেশকে এগিয়ে নিতে কাজ করছে, যেখানে শিশুরা হেসে-খেলে নিরাপদ জীবন কাটায়, যেখানের তরুণীরা দাদি-নানির কাছ থেকে শেখা গান গাইতে গাইতে চাষাবাদ করে ঘরে তুলে নেয় সোনার ফসল, যারা কৃষিতে ইরাকিদের পুরোনো ঐতিহ্য নতুন করে আবিষ্কার করে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেবে।
আমি জানি তুমিও আমার সঙ্গে মিলে এই চিঠি লেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছ। তোমার জন্য আমার ভালোবাসা থাকবে অনন্তকাল।
—নাহলা

সিএনএন অবলম্বনে তপতী বর্মন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *