টানা ২২ বছর ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও ষষ্ঠবারের মতো গুজরাট শাসনের অধিকার অর্জন করল বিজেপি। একই সঙ্গে তারা কংগ্রেসকে ক্ষমতাচ্যুত করল উত্তর ভারতের পাহাড়ি রাজ্য হিমাচল প্রদেশে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাফল্যের পাগড়িতে এই দুই জয় নিঃসন্দেহে দুটি ঝলমলে পালক।

সোমবার সকাল থেকে এই দুই রাজ্যের ফল গণনা শুরু হয়। বেলা যত এগোয়, বিজেপির জয় ততই নিশ্চিত হয়ে যায়। গুজরাটে মোট ১৮২ আসনের মধ্যে বিজেপি ১০৪ আসনে এগিয়ে, কংগ্রেস এগিয়ে ৭৫টিতে। তিন কেন্দ্রে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জয়ের সম্ভাবনা।

হিমাচল প্রদেশে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর সরকারের পরিবর্তন ঘটে। এবারও তার ব্যতিক্রম ঘটছে না। ৬৮ আসনবিশিষ্ট বিধানসভায় বিজেপি ৪৫ আসনে এগিয়ে, কংগ্রেস ১৯টিতে। হিমাচল হারানোর ফলে দেশে কংগ্রেস শাসিত রাজ্যের সংখ্যা দাঁড়াল ৪-এ। কর্ণাটক, পাঞ্জাব, মেঘালয় ও মিজোরাম। পাঞ্জাব ছাড়া বাকি তিন রাজ্যে আগামী বছর ভোট। দেশকে কংগ্রেস-মুক্ত করার যে ডাক নরেন্দ্র মোদি দিয়েছেন, তা ব্যর্থ করাই কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধীর কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

হিমাচলে যে পালাবদল ঘটতে চলেছে, সে বিষয়ে কারও মনে বিশেষ সন্দেহ বা সংশয় ছিল না। কিন্তু আগ্রহ ছিল গুজরাট নিয়ে। আগ্রহের কারণ একাধিক। নরেন্দ্র মোদি গুজরাটের মানুষ। মুখ্যমন্ত্রিত্ব ছেড়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হন ২০১৪ সালে। বিজেপি সভাপতি অমিত শাহও গুজরাটি। এই প্রথম গুজরাটে ভোট হচ্ছে যখন রাজ্য ও কেন্দ্র দুই জায়গাতেই বিজেপি ক্ষমতায়। কাজেই গুজরাটে জেতা-হারার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল প্রধানমন্ত্রী ও দল সভাপতির সম্মান।

একই রকম সম্মানের প্রশ্ন ছিল কংগ্রেসের কাছেও। ২২ বছর ওই রাজ্যে কংগ্রেস ক্ষমতার বাইরে। রাহুল তাই কোমর কষে নেমেছিলেন বিজেপিকে ক্ষমতাচ্যুত করতে। গত চার মাস ধরে তিনি রাজ্য চষে বেড়িয়েছেন। ক্ষুব্ধ পাতিদার নেতা হার্দিক প্যাটেলের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন। দলে নিয়েছেন অনগ্রসর নেতা অল্পেশ ঠাকোরকে। সমর্থন করেছেন দলিত নেতা জিঘ্নেশ মেওয়ানিকে। জাতপাতের এই সমীকরণ হাতিয়ার করে রাহুল চেয়েছিলেন বিজেপির কাছ থেকে ক্ষমতা ছিনিয়ে নিতে। কিন্তু লক্ষ্যের অনেক কাছে এগিয়েও শেষ পর্যন্ত কংগ্রেসকে পিছিয়ে পড়তে হলো।

বিজেপি গুজরাট দখলে রাখতে পারলেও এবারের ভোটে তাদের রমরমা ও জৌলুশ অনেকটাই ম্লান। অমিত শাহ কম করে ১৫০ আসন জেতার দাবি জানিয়েছিলেন। কিন্তু দেড় শ তো দূরের কথা, গতবারের জেতা আসনগুলোও তারা ধরে রাখতে পারেনি। ২০১২ সালে বিজেপি জিতেছিল ১১৫ আসন। এবার নিশ্চিতভাবেই তার চেয়ে অনেক কম পাচ্ছে। তুলনায় গতবারের চেয়ে কংগ্রেস তাদের আসনসংখ্যা বাড়াতে চলেছে। গতবার ছিল ৬১, এবার ৮০র মতো। প্রাপ্ত ভোটের হার বেড়েছে দুই দলেই। বিজেপি পেতে চলেছে ৪৯ শতাংশ ভোট, কংগ্রেস প্রায় ৪২ শতাংশ। কিন্তু কমে গেছে বিজেপির জয়ের মার্জিন। এসব বিবেচনা করলে দেখা যাচ্ছে, ক্ষমতা ধরে রাখলেও এই ভোট বিজেপি রাজ্য নেতৃত্বের কাছে অনেকগুলো প্রশ্ন রেখে দিচ্ছে।

এবারের ভোট ছিল গুজরাটের গ্রাম বনাম শহরের লড়াই। সেদিক থেকে দেখলে গ্রামীণ গুজরাটে কংগ্রেস তাদের প্রাধান্য বিস্তার করেছে। বিজেপি ভালো করেছে শহর ও আধা শহরে। গ্রামীণ পাতিদারেরা কংগ্রেসকে যেমন ঢালাও ভোট দিয়েছে, শহুরে প্যাটেলরা তেমন ঝুলি ভরিয়েছে বিজেপির।

বিজেপি লড়াইটা শুরু করেছিল প্রগতি ও উন্নয়নকে হাতিয়ার করে। কিন্তু ভোট যত এগিয়েছে, বিজেপি ততই বড় করে তুলে ধরেছে হিন্দুত্বকে। প্রশ্ন করতে শুরু করে রাহুলের মন্দির পরিক্রমাকে। ভোটের একেবারে শেষ পর্বে তারা সাম্প্রদায়িকতা ও পাকিস্তানকে বড় করে তুলে ধরে। পাশাপাশি টেনে আনে গুজরাটি অস্মিতা বা জাত্যভিমানকে।

গুজরাটের ফল কংগ্রেসের কাছে যথেষ্ট আশাব্যঞ্জক। কিন্তু রাহুলের কাছে আগামী দিনের লড়াই আরও কঠিন। আগামী বছরের গোড়ায় মেঘালয় ও মিজোরামে ভোট। এই দুই রাজ্য কংগ্রেসের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে নরেন্দ্র মোদি নতুন উদ্যমে নামছেন। বিজেপি নজর দিয়েছে কর্ণাটকেও। কংগ্রেসের হাত থেকে রাজ্যটি দখল করতে তারা মরিয়া। আগামী বছর কর্ণাটকের সঙ্গে মধ্য প্রদেশ ও রাজস্থানেও ভোট। এই দুই রাজ্যে বিজেপির প্রতিদ্বন্দ্বী কংগ্রেসই। সারা দেশে কৃষক অসন্তোষকে কংগ্রেস যেভাবে বড় করে তুলে ধরেছে, তাতে মধ্য প্রদেশ ও রাজস্থানে বিজেপি বিশেষ স্বস্তিতে নেই।

বিজেপি গুজরাট জিততে চলেছে ঠিকই, কিন্তু এই জয় তাদের অবশ্যই আনন্দে উদ্বেলিত করবে না। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা এই ফলকে বিজেপির নৈতিক পরাজয়েরই শামিল বলে মনে করছেন।