রবিবার, মে ২৭, ২০১৮, ১২:২৫ পূর্বাহ্ণ

নিউজ মিডিয়া ২৪: ডেস্ক: সম্প্রতি বড় ধরনের একটি পরিবর্তন হয়েছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীতে। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা মেজর জেনারেল অং সোয়েকে গত শুক্রবার সেনাবাহিনীতে ফেরত পাঠানো হয়েছে। সেখানে তিনি দায়িত্ব নেবেন বিশেষ অভিযানের দায়িত্বপ্রাপ্ত শাখার।

মেজর জেনারেল পদ থেকে লেফট্যানেন্ট জেনারেল পদে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে অং সোয়েকে। এখনো মন্ত্রীসভা থেকে পদত্যাগ না করলেও শীঘ্রই করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তিনি সেনাবাহিনীর ব্যুরো অব স্পেশাল অপারেশন (বিএসও) এর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেবেন। বিএসও মিয়ানমার সেনাবাহিনীর আঞ্চলিক কমান্ডগুলো তত্ত্বাবধান করে এবং সরাসরি সেনাপ্রধান জেনারেল মিন অং লাইং-এর কাছে রিপোর্ট করে।

এছাড়া নতুন দায়িত্বের আওতায় লেফট্যানেন্ট জেনারেল অং সোয়ে বিএসও-৬ এর দায়িত্বও পালন করবেন।

চলতি সপ্তাহের শুরুতে এই কমান্ডটির প্রধান লেফট্যানেন্ট জেনারেল অং কিয়াও জংকে সরিয়ে দেয়া হয়। আর মন্ত্রীসভায় লেফট্যানেন্ট জেনারেল অং সোয়ে’র জায়গায় আসতে যাচ্ছেন ডিফেন্স সার্ভিস অ্যাকাডেমির বর্তমান প্রধান মেজর জেনারেল অং থু।

লেফট্যানেন্ট জেনারেল অং সোয়ে ডিফেন্স সার্ভিস একাডেমি থেকে উঠে এসেছেন। এর আগে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন ৩৩ ডিভিশন উত্তর-পূর্ব আঞ্চলিক কমান্ডের প্রধান হিসেবে। এর আগে তিনি প্রধানমন্ত্রী থেই সিয়েনের প্রশাসনেও তিনি স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

সাবেক জয়েন্ট চিফ অব স্টাফ জেনারেল লা তে উইন বলেন, কোনও সেনা কর্মকর্তা মন্ত্রিসভায় যোগ দেয়ার পর আবার সেনাবাহিনীতে ফিরে আসা ও পদোন্নতি পাওয়ার ঘটনা বিরল মিয়ানমারের ইতিহাসে। তিনিই সম্ভবত এ ধরনের প্রথম ব্যক্তি।

মিয়ানমারের সংবিধান অনুযায়ী দেশটিতে স্বরাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা ও সীমান্ত বিষয়ক মন্ত্রী নিয়োগ দিতে পারে সেনাবাহিনী। দীর্ঘদিনের সেনা শাসনে পিষ্ঠ দেশটিতে এমন অদ্ভুত সংবিধান প্রণীত হয়েছে সেনাবাহিনীর কর্তৃত্ব বজায় রাখতে।

থিঙ্ক ট্যাঙ্ক থাগাউং ইনস্টিটিউট অব পলিটিক্যাল সায়েন্সের নির্বাহী পরিচালক কো ইয়ে মিয়ো হেইন মনে করেন, রাখাইন রাজ্যের সাম্প্রতিক সঙ্ঘাত ও পরবর্তি পরিস্থিতির সাথে সম্পর্ক রয়েছে এই পরিবর্তনে।

ইয়াঙ্গুনের আরেক সামরিক বিশ্লেষক ইরাওয়াদিকে বলেন, লেফট্যানেন্ট জেনারেল অং কিয়াও জংকে পশ্চিম কমান্ডের দায়িত্ব নিয়ে সাবেক কমান্ডার মেজর জেনারেল মং মং সোয়ের কর্মকা-ের দায়ভার নিতে হবে। প্রসঙ্গত, রোহিঙ্গা মুসলিম অধ্যুষিত রাখাইন রাজ্যটি এই পশ্চিম কমান্ডের অন্তর্ভূক্ত। রাখাইনে রোহিঙ্গা নিধনে প্রধান ভুমিকা পালন করেছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী।

গত বছর পশ্চিম কমান্ডের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে রাখাইনের রাজধানী নেপিদোর বিএসও-৬ এ বদলি করার আগে অং কিয়াও জং বিএসও-৩ এর দায়িত্বে ছিলেন। সে কমান্ডটি দক্ষিণ পশ্চিম, দক্ষিণ ও পশ্চিম সামরিক কমান্ডের দায়িত্বে ছিলেন। এছাড়া যৌথ যুদ্ধবিরতি তদারকি কমিটির সদস্যও ছিলেন তিনি, যে কমিটিটি শান্তি আলোচনায় অংশ নিয়েছে।
ওই সময়ই রাখাইনে রোহিঙ্গা সঙ্কট সবচেয়ে বেশি ভয়াবহতা লাভ করেছে। গত বছর আগস্টের পর থেকে প্রায় আট লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। হত্যা করা হয়েছে কয়েক হাজার রোহিঙ্গা মুসলিমকে।

গত এক মাস ধরেই মিয়ানমারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ে বড় ধরনের অনেকগুলো পরিবর্তন হয়েছে। পুলিশ ও অন্যান্য কয়েকজন বড় কর্মকর্তাকে বরখাস্ত কিংবা বদলি করা হয়েছে। সর্বশেষ গত রোববারও দক্ষিণপশ্চিমাঞ্চলীয় কমান্ডের প্রধান মেজর জেনারেল নই নই সোয়ে, ও ১০১ ডিভিশনের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মং মং জানকে বরখাস্ত করে পরে আবার সহায়ক প্রতিষ্ঠানে পোস্টিং দেয়া হয়েছে।

কো এ মিয়ো হেইন মনে করেন, আরো পরিবর্তন আসতে পারে। তিনি বলেন, গত মাসে জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদ ও অন্যান্য বিশ্ব সম্প্রদায়ের নেতাদের মিয়ানমার সফরের সময় সেনাপ্রধান বিতর্কীত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার যে আশ্বাস দিয়েছিলেন, এটি তারই অংশ।

ব্যুরো অব স্পেশাল অপারেশন বা বিএসও’র নতুন প্রধান অং সোয়ের ভালো সম্পর্ক রয়েছে রাজনীতিবীদ ও মন্ত্রীসভার অন্যান্য সদস্যদের সাথে। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী থাকাকালে তার প্রশাসনের অন্য সব স্তরের কর্মকর্তাদের সাথেই সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। অনেক মন্ত্রী ও এমপি তার সেনাবাহিনীতে ফিরে যাওয়ার ঘটনাকে তাদের জন্য ক্ষতিকর হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষের এমপি ইউ নে মিয়ো তুন ইয়াঙ্গুন থেকে এমপি নির্বাচিত হয়েছে। তিনি বলেন, তিনি খুবই আন্তরিক ও সহযোগিতা পরায়ন। তাকে হারিয়ে আমাদের ক্ষতি হয়েছে।

অনেক দিন ধরেই রোহিঙ্গা নির্যাতনের অভিযোগে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ অব্যাহত রয়েছে। ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের রাজস্ব ও পররাষ্ট্র বিভাগ মিয়ানমারের বেশ কয়েকজন সেনা কর্মকর্তাকে তাদের কালো তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করেছে। গত বছরের সর্বশেষ রোহিঙ্গা নিপীড়নের ঘটনায় সরাসরি জড়িত ছিল দেশটির সেনাবাহিনী। সেনাবাহিনী পাঠিয়ে দেশের কোন জনগোষ্ঠিকে এমন নির্মূল করার ঘটনা হিটলারে নাৎসি বাহিনীর পর আর বিশ্বে দেখা যায়নি।

গণতন্ত্রকামী নেত্রী হিসেবে পরিচিত হলেও মিয়ানমারের ক্ষমতাসীন দলের নেত্রী ও স্টেট কাউন্সিলর অং সান সুচির নিবর সমর্থন ছিলো রোহিঙ্গা নিধন অভিযানে।