দেশে একদিকে উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে সরকারি চাকরির প্রতি তরুণদের আগ্রহ বাড়ছে। কিছুদিন আগে প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক কলামে এই প্রবণতাকে বিসিএস উন্মাদনা হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলাম। কারণ, সবাই তো আর সরকারি চাকরি পাবে না; যঁারা সেটা পাবেন না, তঁারা কী করবেন? তঁাদের সিংহভাগ যে অন্য চাকরির জন্য নিজেদের প্রস্তুত করছেন, তা–ও নয়। ফলে চাকরির বাজারে একধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপাত্ত মতে, ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত পঁাচ বছর সময়ে বিসিএস ক্যাডার সার্ভিসে প্রায় ১৮ হাজার এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রায় ৩ লাখ ৮৬ হাজার নিয়োগ হয়েছে। অথচ প্রতিবছর স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করছেন প্রায় সাড়ে চার লাখ শিক্ষার্থী। অন্যদিকে এই মুহূর্তে সরকারের মন্ত্রণালয়গুলোতে বিভিন্ন পর্যায়ে সাড়ে তিন লাখের বেশি পদ শূন্য আছে। সব মিলিয়ে এক বছরে পাস করা তরুণ যদি সর্বনিম্ন বেতন স্কেলেও চাকরি করতে রাজি থাকেন, তারপরও তঁাদের সবাইকে সরকারি চাকরি পেতে পঁাচ বছর সময় লাগবে। কিন্তু প্রতিবছর যে আরও সমানসংখ্যক স্নাতক বের হচ্ছেন, তঁাদের জায়গা কোথায় হবে? বিশ্বব্যাংকের উপাত্ত মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রাথমিকের গণ্ডি পেরোনোর পর মাধ্যমিকে ভর্তি হয়েছে প্রায় ৬০ শতাংশ শিক্ষার্থী। আবার এই ৬০ শতাংশের মধ্যে ১৫ শতাংশ মাধ্যমিক পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন মাধ্যমিক-উত্তর কোর্সে ভর্তি হয়; এর অর্থ হলো, এই সাড়ে চার লাখ উচ্চশিক্ষিতের বাইরে বড় একটা অংশ মাধ্যমিক পেরোনো তরুণ রয়ে গেছে, যারা পরবর্তী পর্যায়ের শিক্ষা পায়নি। আবার সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উচ্চমাধ্যমিক উত্তীর্ণ তরুণের সংখ্যা প্রায় ৮ লাখ, যা মোট শ্রমশক্তির প্রায় ১০ শতাংশ। তঁাদের যে অংশটা উচ্চমাধ্যমিক-উত্তর শিক্ষা গ্রহণ করেন, তঁারা যদি সরকারি বেতনের ১৬তম গ্রেডে চাকরি করতেও ইচ্ছুক হন, তাতেও সবার পক্ষে সরকারি চাকরি জোটানো সম্ভব হবে না। প্রকৃত অর্থে প্রতিবছর ৭০ থেকে ৮০ হাজার সরকারি শূন্যপদে নিয়োগ হয়। এর অর্থ হলো, উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে পঁাচজনে একজনের সরকারি চাকরি ভাগ্যে জোটে। অন্যদিকে বিবিএসের পরিসংখ্যান বর্ষ গ্রন্থ ২০১৬ থেকে পাওয়া পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৫ সালের সরকারি চাকরিতে মোট নিয়োগের ৭২ শতাংশ ছিল তৃতীয় শ্রেণির পদের বিপরীতে, প্রথম শ্রেণিতে নিয়োগ হয়েছে শতকরা ৭ ও দ্বিতীয় শ্রেণির জন্য শতকরা ১৬ ভাগ। সব মিলিয়ে এটা শ্রমশক্তির ১০ ভাগের বেশি নয়। তাহলে অন্যদের বেসরকারি চাকরির ওপর নির্ভর করতে হয়। সাধারণভাবে মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি যত বেশি হবে, তত বেশি কর্মসংস্থান হবে। তাই প্রাথমিকভাবে সেটা নিশ্চিত করতে দেশে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিকল্প নেই।

দেশে তিন কারণে বেকারত্ব হয়—শ্রমের চাহিদা কম কিংবা জোগান বেশি হলে ও শ্রমদক্ষতার চাহিদার সঙ্গে দক্ষ শ্রমিকের সরবরাহের মিলন না হলে। ওপরের দুটির চেয়ে তৃতীয়টি বেদনাদায়ক। চাকরির বাজারে চাকরি আছে, বেকার শ্রমিকও আছেন, কিন্তু বেকারের হাতে চাকরি আসছে না। এবার তত্ত্ব রেখে উপাত্তে ফিরে আসি। দক্ষতার ঘাটতি নিয়ে সম্প্রতি বিআইডিএসের একটি সমীক্ষা প্রকাশিত হয়েছে। অর্থনীতির তিন খাতের মধ্যে শ্রমশক্তির ৪২ ভাগের অধিক কৃষি খাতে কর্মরত, অথচ জিডিপিতে এই খাতের অবদান দিনকে দিন কমছে। কৃষির মধ্যে আবার প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে সবচেয়ে বেশি দক্ষতার অভাব রয়েছে। জিডিপিতে শিল্প খাতের মোট অবদানের প্রায় ২৫ শতাংশ আসে তৈরি পোশাকশিল্প থেকে, এই পোশাক খাতেই দক্ষতার অভাবের সূচকে দ্বিতীয়। মোটের ওপর আমাদের দেশের শ্রমশক্তির মধ্যে মারাত্মক রকমের দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে। আমাদের তরুণেরা উচ্চশিক্ষার কালপর্বেও তঁারা বুঝতে পারেন না, কোন পথটা তঁাদের জন্য সঠিক। এই লম্বা সময়ে খুব কমসংখ্যক শিক্ষার্থী চাকরির বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো বিশেষায়িত দক্ষতা অর্জন করছেন।

এশিয়া ফাউন্ডেশন পরিচালিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির দুই অধ্যাপকের (খন্দকার বজলুল হক ও সেলিম রায়হান) গবেষণায় কর্মসংস্থানে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতের অবদান এবং খাতভিত্তিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ওই খাতে কর্মসংস্থানের বৃদ্ধি কী মাত্রায় ঘটে, সে–বিষয়ক একটি চিত্র পাওয়া যায়। কৃষি, বন ও মৎস্য খাতের কর্মসংস্থানে সম্মিলিত অবদান প্রায় ৪৫ শতাংশ, বাণিজ্য, হোটেল ও রেস্টুরেন্টের সম্মিলিত অবদান ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ এবং পোশাক খাতের অবদান ৮ দশমিক ৫ শতাংশের মতো। কিন্তু খাতভিত্তিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার হিসাব করলে দেখা যায়, অন্য খাতগুলো এগিয়ে আছে। ২০১৩ সালে বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি উৎপাদন খাতের প্রবৃদ্ধি ১ শতাংশ বাড়লে কর্মসংস্থান ২১ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। কর্মসংস্থান বৃদ্ধির পরিসংখ্যানে এগিয়ে থাকা অন্যান্য খাত হলো কেমিক্যাল, রাবার ও প্লাস্টিক (সম্মিলিত), খনিজ শিল্প, চামড়া ও চামড়াজাত শিল্প (সম্মিলিত)। যেসব খাতের আকার বড়, সেখানে ধীরে ধীরে কর্মসংস্থান সংকুচিত হচ্ছে। এখন প্রশ্ন হলো, আমার শিক্ষা কি উক্ত খাতগুলোর জন্য দক্ষ জনশক্তি সরবরাহ করতে পারছে কিংবা তরুণদের পছন্দের তালিকায় কি উক্ত খাতগুলো আছে? তরুণদের পছন্দের তালিকায় আছে অর্থনীতির ৩ শতাংশ দখল করে রাখা জনপ্রশাসন ও সামরিক খাত, মোট কর্মসংস্থানে যাদের অবদান শতকরা ১ দশমিক ৫ ভাগের নিচে।

আমাদের বাস্তবতা হলো, ১৮ পেরোনোর পরও তরুণদের বুকে সাহস আসে না। জীবনঘনিষ্ঠ বিভিন্ন ঝুঁকি থেকে অন্য সবার মতো তরুণেরাও মুক্ত নয়। সে কারণে সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীকে আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজন আছে, যাতে জীবনের বিভিন্ন বয়সে যে ঝুঁকিগুলো রয়েছে, সেগুলো তারুণ্যের চিন্তার প্রবাহে প্রতিবন্ধক হয়ে না দঁাড়ায়। পরিবারেও এই চিন্তার চাষাবাদ হওয়া দরকার। আর আন্তর্জাতিক শ্রম আইনগুলো যাতে বেসরকারি খাতের চাকরিজীবীদের জন্যও প্রযোজ্য হয়, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারকে এ ব্যাপারে কঠোর হতে হবে। সাধারণ শিক্ষার চেয়ে বিশেষায়িত শিক্ষায় বেশি জোর দিতে হবে। কোন খাতে কেমন জনবল দরকার বা আগামী দিনে কোন খাত বিকশিত হবে, শিক্ষাব্যবস্থাকে সেই চাহিদা অনুযায়ী ঢেলে সাজাতে হবে। এ জন্য দরকার সমন্বিত নীতি ও তৎপরতা। তা না হলে আমরা জনসংখ্যা ডিভিডেন্ড কাজে লাগাতে পারব না। বেকারত্ব সমস্যারও সমাধান হবে না। শহিদুল ইসলাম: গবেষণা সহযোগী, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস)।