অর্ধেকের বেশি পোশাক কারখানার শ্রমিক গতকাল সোমবার পর্যন্ত ঈদ বোনাস বা উৎসব ভাতা পাননি। যদিও তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, ২০ রমজানের মধ্যে পোশাকশ্রমিকদের ভাতা দেওয়া হবে। তবে প্রতিবছরের মতো এবারও কারখানা মালিকেরা বিজিএমইএর কথা মানলেন না। অবশ্য সংগঠনটির সদস্য নয় এমন কারখানাও রয়েছে ভাতা না দেওয়ার তালিকায়।

এদিকে শ্রমিকনেতারা এক মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ অর্থ ঈদ বোনাস হিসেবে দাবি করলেও তার কোনো বাস্তব প্রতিফলন নেই। শ্রমিকনেতারা অভিযোগ করেছেন, অধিকাংশ কারখানাই বোনাস হিসেবে মূল বেতনের ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ অর্থ দিচ্ছে। অল্প কিছু উন্নত মানসম্পন্ন কারখানা দিচ্ছে মূল বেতনের ৮০ থেকে ১০০ শতাংশ অর্থ।

শ্রম মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের (ডিআইএফই) একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গত রোববার পর্যন্ত ঢাকার ৪০ শতাংশ, গাজীপুরের ৫২ শতাংশ ও নারায়ণগঞ্জের ৪৫ শতাংশ কারখানা উৎসব ভাতা দিয়েছে। গতকালও বেশ কিছু কারখানায় উৎসব ভাতা দেওয়া হয়েছে। তাতে ঢাকার ৫০ দশমিক ৮৮ শতাংশ, গাজীপুরের ৬০ শতাংশ, নারায়ণগঞ্জের ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ এবং চট্টগ্রামে সবচেয়ে কম, ৫-১০ শতাংশ কারখানা ভাতা পরিশোধ করেছে। সব মিলিয়ে গতকাল পর্যন্ত ৫০ শতাংশের কিছু কম কারখানা ভাতা দিয়েছে। প্রায় একই তথ্য দিলেন একাধিক শ্রমিক সংগঠনের নেতারা।

ডিআইএফইর ২০১৪ সালের তথ্যভান্ডার অনুযায়ী, সারা দেশে ৪ হাজার ৭৬৫টি (ইপিজেডের কারখানা অন্তর্ভুক্ত নয়) পোশাক কারখানা আছে। এর মধ্যে ঢাকায় ১ হাজার ৯৬১টি, গাজীপুরে ১ হাজার ২৯৭টি, নারায়ণগঞ্জে ৭৩৪টি ও চট্টগ্রামে ৬৭৪টি কারখানা আছে। এসব কারখানার অধিকাংশই বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর সদস্য। তবে বর্তমানে নতুন কারখানা যেমন স্থাপিত হয়েছে, তেমনি কিছু কারখানা আবার উৎপাদনে নেই। যেমন চট্টগ্রামে চালু কারখানার সংখ্যা কমে ২৯৮টি হয়েছে। অন্যদিকে গাজীপুরে কারখানার সংখ্যা বেড়ে দেড় হাজারের মতো হয়েছে।

গত ২৯ মে পোশাকশিল্পের ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট বিষয়ক কোর কমিটির ৩৩তম সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা শেষে বিজিএমইএর সহসভাপতি মোহাম্মদ নাছির প্রতিশ্রুতি দেন, ২০ রমজানের মধ্যে শ্রমিকদের উৎসব ভাতা দিয়ে দেবেন কারখানার মালিকেরা। সর্বশেষ গত শনিবার তিনি প্রথম আলোকে বলেন, সোমবারের (গতকাল) মধ্যে অধিকাংশ কারখানার মালিকই শ্রমিকের ভাতা দিয়ে দেবেন। এ ছাড়া ২২ জুনের মধ্যে চলতি মাসের ১০-১৫ দিনের মজুরি পেয়ে যাবেন শ্রমিকেরা।

অবশ্য এসব প্রতিশ্রুতির বিষয়ে জানতে চাইলে বিজিএমইএর সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘যে কারখানা যেদিন ছুটি দেবে সেদিন শ্রমিকের বেতন-ভাতাসহ অন্য পাওনাদি বুঝিয়ে দেবে। বিষয়টি নিয়ে অন্যদের পেটব্যথার কোনো দরকার নেই। ব্যথা গার্মেন্টস মালিকদের, যাঁরা ব্যবসা করেন।’

কত কারখানা উৎসব ভাতা দিয়েছে—এমন প্রশ্নের উত্তরে সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘আমার কাছে কোনো হিসাব নেই। কারণ, হাজার হাজার কারখানা, কে দিছে না দিছে, কে জানে। তবে বিজিএমইএর সভাপতি হিসেবে কারখানা মালিকদের উদ্দেশে আমি বলতে চাই, ঈদের আগে শ্রমিক ভাইবোনের বেতন-ভাতা বুঝিয়ে দিতে হবে।’

জানতে চাইলে বাংলাদেশ জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক কর্মচারী লীগের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘সাভার-আশুলিয়া ও গাজীপুরের কিছু পোশাক কারখানা ঈদ বোনাস দেওয়া শুরু করেছে। তবে ঢাকা মহানগরী ও চট্টগ্রামের অবস্থা খুবই খারাপ। সব মিলিয়ে ৫০ শতাংশ কারখানা ঈদ বোনাস দিয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘ঘোষিত সময়ে বেতন-ভাতা না দিলে শেষ সময়ে অনেক কারখানায় সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। গত কয়েক বছরে আমরা এমন কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা দেখেছি।’

সিরাজুল ইসলাম বলেন, আইনের মারপ্যাঁচের কারণেই মালিকেরা সুযোগ নিয়ে শ্রমিকের মূল বেতনের মাত্র ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ অর্থ বোনাস হিসেবে দিচ্ছেন। কিছু কারখানা ৮০ থেকে ১০০ শতাংশ দিলেও তার সংখ্যা খুবই নগণ্য। তাই উৎসব ভাতার বিষয়ে শ্রম আইনে সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকা দরকার।

জানতে চাইলে ডিআইএফইর ঢাকা কার্যালয়ের উপমহাপরিদর্শক জাকির হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আগামী শনিবার পর্যন্ত কারখানাগুলো শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করবে। আশা করছি, কোনো সমস্যা হবে না। তবে এখন পর্যন্ত ঢাকা মহানগরীর খুব কমসংখ্যক কারখানা শ্রমিকের ভাতা দিয়েছে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published.