ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের এই দশা এবারও ঈদযাত্রায় দুর্ভোগের শঙ্কা জাগাচ্ছে। কারণ ঈদের সময় এই মহাসড়কে উত্তরাঞ্চলগামী গাড়ির সংখ্যা বাড়বে কয়েকগুণ। এই দুর্ভোগের ধকল যাবে ময়মনসিংহগামীদের জন্যও।

মহাসড়কটিতে ছোট-বড় গর্তের পাশাপাশি গাজীপুর চৌরাস্তা থেকে বঙ্গবন্ধু সেতু পর্যন্ত চার লেইনের কাজ চলায় এবার ঈদের সময় গাজীপুর চৌরাস্তা, কোনাবাড়ি, চন্দ্রা, কালিয়াকৈর পর্যন্ত সব জায়গায় যানজটের আশঙ্কা করছেন হাইওয়ে পুলিশসহ পরিবহন সংশ্লিষ্টরা।

ঈদের আগে সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগ নানা উদ্যোগ নিচ্ছে। তবে ভারি বর্ষণ হলে সে উদ্যোগ কতটা সফল হবে তা নিয়ে সন্দিহান খোদ প্রশাসনই। ঈদের আগে যেন ভারি বৃষ্টি না হয়, সেই প্রার্থনাই এখন করছেন তারা।

রোববার সরেজমিনে দেখা যায়, গাজীপুর চৌরাস্তা থেকে বঙ্গবন্ধু সেতু সড়কে চার লেইনের কাজে অনেক জায়গায় দু’পাশের মাটি সরিয়ে নেওয়ায় সড়কের প্রশস্ততা কমেছে।

কোনাবাড়িতে ফ্লাইওভারের নির্মাণ এলাকার দু’পাশের সড়ক ভেঙেচুরে গেছে। ইট ফেলা হলেও সড়কটি এবড়ো-থেবড়ো। যানবাহন চলছে ধীরে গতিতে।

কোনাবাড়ি বাজারে একটি ট্রাক বিকল হয়ে সড়কে পড়ে থাকতে দেখা যায় রোববার সকালে।

এই চিত্র গাজীপুর চৌরাস্তার

এই চিত্র গাজীপুর চৌরাস্তার

ট্রাকচালক মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, সকালে গর্তে পড়ে পেছনের চাকার এক্সেল ভেঙে গেছে। ফলে সরানো সম্ভব হচ্ছে না।

“ভাই, রাস্তা খুব খারাপ। জান বাজি লইয়া গাড়ি চালান লাগে। একটু উনিশ-বিশ হইলে গাড়ি পাল্টি খায়া যায়। সড়কে এত গর্ত, ঝাক্কির ঠেলায় এক্সেল ভাইঙ্গা গ্যাছে।”

উত্তর-দক্ষিণের জেলাগুলোয় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক হয়ে চলা সব বাস মহাখালী এবং গাবতলী বাস টার্মিনাল থেকে চলাচল করে।

গাবতলী থেকে ছেড়ে যাওয়া বাসগুলো সাধারণত চন্দ্রা মোড় দিয়ে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে ওঠে। মহাখালী থেকে উত্তরা-টঙ্গী হয়ে গাজীপুর চৌরাস্তার পর কোনাবাড়ি মুখে শুরু হয় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক। যেদিক থেকে যাওয়া হোক, যানজটের শঙ্কা সবদিকেই।

মহাখালী থেকে গাজীপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে বৃষ্টির পানি জমে তারগাছ, বাসন সড়ক ও ভোগড়ায় বড় বড় গর্ত হয়েছে। গাড়িগুলো ঠিকমতো চলতে পারছে না।

রোববার দুপুরে ইউনিয়ন সিএনজি ফিলিং স্টেশনের সামনে গিয়ে দেখা যায়, সড়কে বিশাল গর্ত এড়াতে বাস-ট্রাক যাচ্ছে ধীরে ধীরে।

এই চিত্র কোনাবাড়ির

এই চিত্র কোনাবাড়ির

মহাখালী থেকে কাপাসিয়াগামী সম্রাট পরিবহনের চালক শামীম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সকাল ৭টায় মহাখালী থেকে আসছি। এখন দেড়টা বাজে, তাও গাজীপুর চৌরাস্তা পার হতে পারি নাই। আল্লাহ জানে ঈদের আগে কী অবস্থা হয়!”

যানবাহন ধীরে চলায় কোনাবাড়িতে সব সময়ই যানজট লেগে আছে। সড়কের গর্তকেই কারণ দেখান গাজীপুর-টাঙ্গাইল রুটের বাসের চালক ইদ্রিস আলী।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “গাড়ি দুই নম্বর গিয়ারের বেশি উঠান যায় না। সর্বোচ্চ ২০ কিলোমিটার গতি উঠান যায়। এই কারণে পিছনের গাড়ি আইটকা যায়। জ্যাম লাগে আস্তে আস্তে।”

বেহাল সড়কের এমন অবস্থায় ট্রাক-কভার্ড ভ্যান যানজট পরিস্থিতি আরও বাড়িয়ে তোলে বলে বলছেন কয়েকজন বাসচালক। এর সঙ্গে লোকাল বাসগুলোর নিয়মের পরোয়া না করে রাস্তায় আড়াআড়ি দাঁড়িয়ে যাত্রী তোলার প্রবণতাকেও দুষছেন তারা।

মাওনা চৌরাস্তা থেকে পঞ্চগড়গামী তানজিলা পরিবহনের চালক মনির হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ট্রাক ও কভার্ড ভ্যানের কারণে সড়কে যানজট তৈরি হয় বেশি।

“রাস্তায় গর্ত দেখলেই ট্রাক স্পিড কমাইয়া গাড়ি থামাইয়া দেয়। আর পানি থাকলে হেরা সামনে আগাবার চায় না। গর্তে পইড়া ফাইস্যা গেলে তো অবস্থা আরও খারাপ হয়।”

এ শঙ্কায় বৃষ্টির সময় কোনো কোনো ট্রাকচালক রাস্তার পাশে গাড়ি বন্ধ করে রাখে বলে দাবি করেন জয়পুরহাটগামী সালমা পরিবহনে চালক শাহীনুল ইসলাম।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বৃষ্টি নামলে অনেক ট্রাক ড্রাইভার গাড়ি বন্ধ কইরে ঘুমাইয়া পড়ে। রাস্তার পাশে রেখে দেয়। এই কারণে জ্যাম লাগে।”

এই চিত্র চন্দ্রার

এই চিত্র চন্দ্রার

চন্দ্রা মোড়ের আগে-পরে সড়কে থাকা অসংখ্য গর্ত ভরাটের কাজ করতে দেখা যায় সওজ এবং সড়ক প্রশস্তকরণের কাজ নিয়োজিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের।

চাঁদ দেখা সাপেক্ষে ঈদ ২৬ বা ২৭ জুনে পড়লেও সপ্তাহের আগে বৃহস্পতিবার শেষ কর্মদিবস। ইতোমধ্যে ঘরমুখে মানুষ চলাচল শুরু করলেও বৃহস্পতিবার থেকেই ঈদযাত্রা পুরোদমে শুরু হচ্ছে।

এর মধ্যে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে ছোটবড় গর্তের সঙ্গে চন্দ্রা থেকে বঙ্গবন্ধু সেতু পর্যন্ত সড়কে নির্মাণকাজ চলায় সামনে আরও যানজটের আশঙ্কা করছেন শ্যামলী পরিবহনের বাসের চালক শাহাবুদ্দিন সাবু।

“রাস্তা নষ্ট, মাঝখানে অনেক গর্ত। রাস্তা বেশি খারাপ হয়্যা গ্যাছে। গাড়ি ব্রেক করতে হচ্ছে বেশি বেশি। অতিরিক্ত ব্রেকের কারণে এই সমস্যা। ঈদে অনেক যানজট হবে।”

তবে বগুড়া রুটের অনিক পরিবহনের চালক জাহাঙ্গীর আলম বলছেন, ঈদের সড়কের ধারণ ক্ষমতার চেয়ে বেশি গাড়ি চলাচল এবং এর সঙ্গে লোকাল বাসগুলো রাস্তার যত্রতত্র আড়াআড়ি দাঁড়িয়ে যাত্রী তোলায়ও যানজট বেড়ে যায়।

“বাইপাইল, আবদুল্লাহপুর, চন্দ্রা, আশুলিয়ায় কয়েকশ বাস দাঁড় করিয়ে যাত্রী উঠায়। তারা ব্যাঁকাত্যাড়া করে গাড়ি রাখে। যেখানে সেখানে যাত্রী ওঠায় নামায়। তারা জ্যাম বাধায় বেশি।”

এদিকে চন্দ্রা এলাকায় যানজটের জন্য কালিয়াকৈরের রেলওভারব্রিজকে একটি কারণ বলে মনে করেন চন্দ্রা মোড়ে দায়িত্বরত ট্রাফিক সার্জেন্ট এনামুল।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “রেল ওভারপাসে উঠতে ভারী যানবাহনের সময় বেশি লাগে আর গাড়ি বিকল হয়। সড়কের ওই অংশ দুই লেইনের একটা গাড়ি নষ্ট হলে সেটা সরাতেই ঘণ্টা পার হয়ে যায়। সামনে পেছনে কয়েক কিলোমিটার যানজট লেগে যায়।

“আমাদের একটি রেকার আছে ১০ টন ক্ষমতার। এর বেশি ওজনের গাড়ি বিকল হলে সেটি সরাতে অন্য জায়গা থেকে রেকার আনতে হয়। ফলে সময় বেশি লাগায় যানজটের তীব্রতাও বাড়ে।”

এদিকে কয়েকটি প্রকল্পের কাজ একসঙ্গে চলায় সড়কে ‘একটু সমস্যা হচ্ছে’ বলছেন গাজীপুর সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী নাহিন রেজা।

এই চিত্র কোনাবাড়ির

এই চিত্র কোনাবাড়ির

তিনি বলেন, ঈদের আগে সড়ক চলাচল উপযোগী করতে সবাই কাজ করছে।

“গত ৫/৬ দিন টানা বৃষ্টি হওয়ায় রাস্তা বেশি খারাপ হয়েছে। তবে আমরা রাতদিন কাজ করছি। শুক্রবারের আগে রাস্তায় পানি থাকবে না। ভাঙাচোরা অংশের বেশিরভাগই মেরামত করে ফেলব।”

চন্দ্রা মোড়ে কথা হয় হাইওয়ে পুলিশের গাজীপুর অঞ্চলের এএসপি এসএম বদরুল আলমের সঙ্গে। সড়ক তদারক করতে আসা এ পুলিশ কর্মকর্তা বলছেন, বৃষ্টি না হলে চন্দ্রায় যানজট কম হবে।

“আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছি, ঈদের সময় যেন বৃষ্টি বাদল না হয়। রাস্তাটা যেন শুকনো থাকে, তাহলে কোনো সমস্যা হবে না। গত কয়েকদিন যেমন বৃষ্টি হয়েছে, এরকম হলে কারোই ক্ষমতা থাকবে না কিছু করার।”

আগের অপ্রশস্ত চন্দ্রা মোড়ের সড়ক এবার প্রশস্ত করার পাশাপাশি বিকল যানবাহন সরাতে বাড়তি রেকার আনা হচ্ছে বলে জানান পুলিশ কর্মকর্তা বদরুল।

তিনি বলেন, “আগে চন্দ্রা মোড়ের সড়ক অপ্রশস্ত ছিল। এবার প্রশস্ত করা হয়েছে। এ কারণে আলাদা আলাদা লেনে গাড়ি আসবে-যাবে। গাজীপুর অঞ্চলে হাইওয়ে পুলিশের চারটি রেকারের সঙ্গে আরও দুটি রেকার আনা হচ্ছে।”

তবে ভারী ওজনের গাড়ি বিকল সমস্যা হবে বলে স্বীকার করেন এএসপি বদরুল।

“যদি কোনো গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়ে, তাহলে সেটা যত ওজনই হোক টেনে নিয়ে আসতে পারে। আর যদি চাকা ভাইঙ্গা বসে যায়, তখন মাল আনলোড করা ছাড়া উপায় নাই। সেখানে দীর্ঘ সময় নেবে।”

Leave a Reply

Your email address will not be published.