কয়েক দশক ধরে বেলুচিস্তান পাকিস্তানের প্রতিটি আঞ্চলিক সংকটের সময় সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়ে আসছে, ব্যাপারটা যেন রীতি হয়ে গেছে। আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল, তারা ১৯৭৩ সালে শুরু হওয়া বেলুচ জাতীয়তাবাদীদের বিদ্রোহে সমর্থন দিয়েছিল। জুলফিকার আলী ভুট্টোর নেতৃত্বাধীন ফেডারেল সরকার ইরানের রাজা রেজা শাহের নির্দেশে বেলুচিস্তানের নির্বাচিত প্রাদেশিক সরকার ভেঙে দিলে এই পরিস্থিতির উদ্ভব হয়।

১৯৮০ সালের ডিসেম্বর মাসে আফগানিস্তানে সোভিয়েত আক্রমণের খবর আসার পরপরই সংবাদমাধ্যমে খবর ও ভাষ্য আসতে শুরু করল, বেলুচিস্তানেও ‘সোভিয়েত পরিকল্পনা’ ছিল। ১৯৮১ সালে এশিয়ার জাতীয়তাবাদী আন্দোলনবিষয়ক মার্কিন বিশেষজ্ঞ স্লেইগ হ্যারিসন ইন আফগানিস্তানস শ্যাডো: বেলুচ ন্যাশনালিজম অ্যান্ড সোভিয়েত টেম্পটেশনস শীর্ষক একটি বই লেখেন। ১৯৮০ সালজুড়ে এই বিষয়ে আরও অনেক খবর ও মন্তব্য কলাম বেরিয়েছে। এই যুক্তি দিয়ে সোভিয়েত আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আফগানদের সশস্ত্র প্রতিরোধের প্রতি সমর্থন জানানো হয়েছে।

কথা হচ্ছে, বেলুচ জাতীয়তাবাদীদের সমর্থন দেওয়ার জন্য পাকিস্তান ভারত ও আফগানিস্তানকে দোষারোপ করে। অন্যদিকে পাকিস্তানের পূর্ব ও পশ্চিমের প্রতিবেশীদের অভিযোগ, পাকিস্তান তাদের বিরুদ্ধে একাধিক অঘোষিত যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। বস্তুত ভারতের নরেন্দ্র মোদি সরকার তো পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হওয়ার পর বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সমর্থন দেওয়ার ব্যাপারে প্রকাশ্য অবস্থান নিয়েছে। অন্যান্য দেশের বৈরী গোয়েন্দা সংস্থাগুলো হয়তো পাকিস্তানের সঙ্গে ‘ইটটি মারলে পাটকেলটি খেতে হবে’-জাতীয় খেলা শুরু করেছে। অথবা তারা নিজেদের অ্যাজেন্ডা নিয়ে পাকিস্তানকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে।

ঘটনার মাজেজা হলো, বেলুচিস্তানের সবকিছু ঠিকঠাক নেই। ২০০৫ সাল থেকে মাঝেমধ্যে সাময়িক বিরতিসহ বেলুচিস্তানের দীর্ঘতম ও বিস্তৃত জাতীয়তাবাদী বিদ্রোহের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চলছে (গত ৭০ বছরে এ নিয়ে চতুর্থবারের মতো)। বেলুচিস্তানের হারিয়ে যাওয়া ও রাস্তায় লাশ পড়ে থাকা মানুষের তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে। ২০১৪-১৫ সালে এই রক্তপাতের রাজনৈতিক সমাধানের চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। এ ছাড়া বেলুচিস্তানের রাজধানী কোয়েটার আশপাশে আফগান তালেবান নেতাদের উপস্থিতি তো এখন উন্মুক্ত রহস্য।

অন্যদিকে এলইজির মতো উপদলীয় সন্ত্রাসীরা বহু বছর ধরে শিয়া হাজারাদের নির্বিচারে হত্যা করছে। অন্যদিকে ইরানবিরোধী জঙ্গি সংগঠন যেমন জানুদল্লাহ ও জাইসুল আদি সীমান্ত এলাকায় সক্রিয়। এতে পাকিস্তান ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে। শেষে বললেও কথাটা কম গুরুত্বপূর্ণ নয়, চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরের কারণেও বেলুচিস্তান তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, প্রস্তাবিত বাণিজ্যপথটি বেলুচিস্তানের গদর সমুদ্রবন্দরকে চীনের পশ্চিমাঞ্চলের জিন জিয়াংয়ের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

এবার একটু এগিয়ে যাই। ব্যাপারটা হলো, সৌদি নেতৃত্বাধীন ও ইসরায়েল-সমর্থিত ইরানবিরোধী জোট যখন যুদ্ধকে ইরান পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার কথা বলে, তারা হয়তো তিনটি ফ্রন্ট খোলার চিন্তা করে। প্রথম ফ্রন্টটি উপদলীয় যুদ্ধের, এর অর্থ হলো, শিয়া-অধ্যুষিত ধর্মতান্ত্রিক দেশে সুন্নিরা যেখানে শিয়া ধর্মীয় নেতাদের দ্বারা বৈষম্যের শিকার হন, সেখানে শিয়া-সুন্নি বিভাজন কাজে লাগানো।

দ্বিতীয় ফ্রন্টে নৃতাত্ত্বিক যুদ্ধ চলবে, অপারসিক নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী যেমন আরব, কুর্দি, বেলুচ, আজেরিস, তুর্কমেনসহ অন্যান্য সংখ্যালঘু গোষ্ঠীকে কাজে লাগিয়ে ইরানকে অস্থিতিশীল করা যাবে।

তৃতীয় ফ্রন্টে নিপীড়নমূলক ধর্মতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে লড়াইরত চরমপন্থীবিরোধী শক্তিগুলোকে কাজে লাগানো হবে।

শেষ ফ্রন্টটা তেমন একটা কার্যকর না-ও হতে পারে। কারণ, ইরানের সিংহভাগ নাগরিক বৈরী দেশের সহায়তা নিয়ে নিজ দেশে সরকার পরিবর্তন করাটা পছন্দ করবে না। এ ছাড়া সৌদি রাজতন্ত্র ও আরব শেখতন্ত্রও একইভাবে নিপীড়নমূলক ও গণতন্ত্রবিরোধী, যদি তারা ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের মতো অতটা না-ও হয়।

তাই নজরটা উপদলীয় ও নৃতাত্ত্বিক ফ্রন্টেই থাকার কথা, যেটা অনেক ক্ষেত্রেই যুগপৎ ঘটে থাকে। বেলুচরা নৃতাত্ত্বিকভাবে এ অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ, কুর্দিদের মতো তারাও নানা অঞ্চলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। তারাও অনেক দিন ধরে স্বায়ত্তশাসন ও বিচ্ছিন্নতার দাবিতে আন্দোলন করছে। মধ্য এশিয়ার অনেক দেশেই বেলুচদের বসবাস। অনেক বেলুচ নাগরিকই পারস্য উপসাগর ও আরব উপসাগর নামকরণের বিরোধিতা করেন। কারণ, করাচি থেকে চাহবাহার ও তার পর পর্যন্ত উপকূলীয় এলাকায় মূলত বেলুচদেরই বসবাস। সে কারণে তাঁদের দাবি, এই এলাকার প্রকৃত নাম হওয়া উচিত বেলুচ উপসাগর।

অতীত অভিজ্ঞতা আমলে নিলে বলতে হয়, সৌদি আরবের টাকা সুন্নি চরমপন্থীদের হাতেই পড়বে। আগেই বলেছি, বেলুচিস্তানে ইরান ও শিয়াবিরোধী চরমপন্থীদের সংগঠন সক্রিয় আছে। এমনকি জামাত-উদ-দাওয়া (নিষিদ্ধঘোষিত লস্কর-ই-তাইয়েবার নতুন নাম) দেশের অখণ্ডতা রক্ষার জন্য বেলুচিস্তানের পক্ষে প্রকাশ্যে কাজ করছে। উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে ধর্মীয় সংগঠন ও মসজিদে যে টাকা যাচ্ছে, তাতে সালাফিবাদ ও ওয়াহাবি মতবাদের সম্প্রসারণ ঘটছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, জিয়াউল হকের সময় থেকে পাকিস্তানে ধর্মীয় চরমপন্থা ও জঙ্গিবাদকে ‘জাতি গঠনের’ কৌশল হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।

কিন্তু ইরানিরা তো বসে থাকবে না। পাকিস্তানের বেলুচ জাতীয়তাবাদীদের কাছে তারা পৌঁছাতে পারবে। এ কাজ যে তাদের একা একা করতে হবে, তা-ও নয়। বৈরী আফগানিস্তানও তাদের সঙ্গে যোগ দিতে পারে। ফলে এত খেলোয়াড় এক জায়গায় জড়ো হলে বেলুচিস্তান নরকে পরিণত হতে পারে, যার শরীর থেকে এখনই রক্ত ঝরছে। আরও যে রক্তপাত ঘটবে, তাতে বেলুচদের মতো ছোট একটি জাতিগোষ্ঠী নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে।

কিন্তু এই পরিস্থিতিতে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরের কী হবে? পাকিস্তান কি শুধু ‘গুলি ছুড়তে ছুড়তে এগোনোর’ নীতি নিয়ে চলবে, যেটা তারা পূর্ব পাকিস্তানে করেছিল। নাকি তারা রাজনৈতিক সমাধান খোঁজার জন্য রাজনৈতিক পরিশীলনের অনুসন্ধান করবে? পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ ২০১৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর বেলুচিস্তানে যে সর্বদলীয় সম্মেলন আয়োজনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিনি সেটা ভুলে গেছেন। কিন্তু এই মুহূর্তে তিনি গদি বাঁচানোর ঝামেলায় আছেন, জাতীয় রাজনৈতিক কৌশল প্রণয়নের অবস্থা তাঁর নেই।

অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন, পাকিস্তানের দৈনিক নেশন ডট কম ডট পিকে থেকে নেওয়া।

আফ্রাসিয়াব খটক: পাকিস্তানি কলামিস্ট।

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published.