আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে সমালোচনামুখর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাংসদেরা। বাড়তি আবগারি শুল্ক, বাড়তি ভ্যাট এবং সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমানো—এ বিষয়গুলোই তাঁদের সমালোচনার মূল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এ ক্ষেত্রে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতকে নিশানা করে তাঁর বিষোদ্গার করছেন আওয়ামী লীগের নেতারা। এমনকি ব্যক্তিগত আক্রমণও করা হচ্ছে।

গতকাল সোমবার জাতীয় সংসদে কড়া ভাষায় অর্থমন্ত্রীর সমালোচনা করে বক্তব্য দেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, সাবেক তথ্যমন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ। বাজেটের নানা ত্রুটি, ভ্যাট ও আবগারি শুল্ক নিয়ে বক্তব্য দেন আরও অন্তত ১০ জন সাংসদ। গতকাল পর্যন্ত বাজেট অধিবেশনে ১২৬ জন সাংসদ আলোচনায় অংশ নেন, যাঁদের একটা বড় অংশই আবগারি শুল্ক ও ভ্যাট বিষয়ে অর্থমন্ত্রীর প্রস্তাবের সমালোচনা করেন।

গতকাল শেখ সেলিম অর্থমন্ত্রীকে একগুঁয়েমি বন্ধ করা এবং কম কথা বলার আহ্বান জানিয়ে বলেন, এই সংসদের ৩৫০ জন জনপ্রতিনিধি ঠিক করবেন জনগণের কল্যাণে কোনটা থাকবে, কোনটা থাকবে না। মাহবুব উল আলম হানিফ বলেন, হল-মার্কের চার হাজার কোটি টাকা দুর্নীতির পর অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন এ টাকা কিছু নয়। তাহলে আবগারি শুল্কের সামান্য টাকার জন্য সারা দেশের মানুষের মধ্যে আক্ষেপ তৈরি করলেন কেন?

প্রস্তাবিত বাজেট দিয়ে অর্থমন্ত্রী নির্বাচনের আগে জনগণকে ‘বিভ্রান্ত’ করছেন বলে মন্তব্য করেন আবুল কালাম আজাদ। তিনি বলেন, ‘আগামী নির্বাচনে আল্লাহ তাঁকে (অর্থমন্ত্রী) সুযোগ দেবে কি না জানি না। কিন্তু যাদের আওয়ামী লীগ মনোনয়ন দেবে, তারা যাতে নির্বাচন করতে পারে, সেটা খেয়াল করতে হবে।’

সরকার ও আওয়ামী লীগদলীয় সূত্র বলছে, গতকাল একই বিষয়ে এভাবে তিনজনের জোরালো বক্তৃতা অন্য বার্তা বহন করে। শেখ সেলিম ও আবুল কালাম আজাদ একে অপরের ভায়রা ভাই। হানিফও দলের নেতৃত্বের কাছের মানুষ হিসেবে পরিচিত।

এর আগে সংসদে বক্তৃতাকালে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বলেছিলেন, কম আয়ের মানুষের ওপর আবগারি শুল্ক আরোপ মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। বাজেট নিয়ে সংসদে সরকারি দলের নেতাদের এমন তীব্র সমালোচনা ও অর্থমন্ত্রীকে লক্ষ্যবস্তু করার ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে ঘটেনি বলেই মনে করছেন একাধিক সাংসদ।

পরে জানতে চাইলে মাহবুব উল আলম হানিফ প্রথম আলোকে বলেন, সাংসদেরা জনগণের রাজনীতি করেন। সাধারণ মানুষের ভালো-মন্দ সংসদে তুলে ধরা তাঁদের দায়িত্ব। তাঁর কাছে মনে হয়েছে, বাজেটে অর্থমন্ত্রী এমন কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত করেছেন, যা সাধারণ মানুষের স্বার্থের বিরোধী। এ জন্যই তিনি অর্থমন্ত্রীকে সেই বিষয়গুলো ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।

তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলো জানায়, অর্থমন্ত্রীর কাছে অনেক সময় বিভিন্ন দাবি ও তদবির নিয়ে আসেন সরকারদলীয় সাংসদেরা, যেগুলোর বেশির ভাগই অর্থমন্ত্রীর কাছে অবাস্তব ও অযৌক্তিক মনে হয়। এসব তদবিরে সাধারণত সাড়া দেন না অর্থমন্ত্রী। কেউ কেউ তাই সুযোগ বুঝে অর্থমন্ত্রীকে দুকথা শোনানোর জন্য সংসদকে বেছে নিয়েছেন। তা ছাড়া বাজেটে পরিবর্তন যে আসবে, সে কথা অর্থমন্ত্রী নিজেই বলেছেন।

বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের বর্জনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে বর্তমান সংসদ গঠিত। এই সংসদের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন আওয়ামী লীগের দখলে। প্রায় ২৫০টি আসন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের। অনেক নাটকীয়তার পর বিরোধী দল সাব্যস্ত হয় ৩৪ আসন পাওয়া জাতীয় পার্টি। আর ১৬ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থীরা এখন আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন।

১৪ দলের শরিক জাসদের একাংশের কার্যকরী সভাপতি মইন উদ্দীন খান বাদল গতকাল সংসদে বলেন, অর্থমন্ত্রীর ওপর যে পরিমাণ খড়্গ চলছে, বিরোধী দল থাকলে এর চেয়ে বেশি কী হতো, তা তিনি জানেন না। সমালোচনার আগে অর্থমন্ত্রীর অবদান এবং বাস্তবতাও বিবেচনায় নেওয়া উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন।

৪ জুন ১৪ দলের এক বৈঠকে শরিক দলের নেতারা বাজেটে প্রস্তাবিত আবগারি শুল্ক ও ভ্যাট হার নিয়ে তাঁদের অসন্তোষের কথা জানান নেতারা।

অর্থমন্ত্রীকে কেন িনশানা?

সরকার ও আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র বলছে, ব্যাংক হিসাবে বাড়তি আবগারি শুল্ক আরোপের বিষয়টি বাজেটে থাকা উচিত নয়—এ বিষয়ে সরকারি দলের নেতারা একমত। বাজেট পাসের সময় এই মতের প্রতিফলন থাকছে, এটাও প্রায় নিশ্চিত। এরপরও সরকারদলীয় সাংসদ ও গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের এভাবে অর্থমন্ত্রীকে লক্ষ্যবস্তু করার পেছনে ভিন্ন কোনো বার্তা আছে কিনা সে প্রশ্নও রয়েছে।

আওয়ামী লীগের একজন দায়িত্বশীল নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সরকারের কোনো মন্ত্রীকে লক্ষ্যবস্তু করা হলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তা ভালোভাবে নেন না। এর আগে সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে সংসদে সমালোচনা শুরু হলে প্রধানমন্ত্রী তাতে হস্তক্ষেপ করেন। কিন্তু অর্থমন্ত্রীর বিরুদ্ধে সমালোচনার বিষয়ে হস্তক্ষেপের ঘটনা ঘটেনি। আরেকটি হতে পারে বাজেট-সংক্রান্ত সমালোচনার দায়ভার দল ও সরকারের ঘাড়ে না ফেলে ব্যক্তি অর্থমন্ত্রীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া। সংসদের চলতি অধিবেশনের আগামী কার্যদিবসগুলোতেও অর্থমন্ত্রীর বিরুদ্ধে এ সমালোচনা অব্যাহত থাকতে পারে বলে সূত্র জানায়।

বাজেট মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত

নিয়মানুযায়ী জাতীয় সংসদে বাজেট পাসের ঠিক আগে বিশেষ মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রস্তাবিত বাজেট অনুমোদন করতে হয়। ১ জুন এবারের বাজেটকে অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। সেখানে বাজেট নিয়ে আলোচনারও সুযোগ থাকে। তারপরও ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের বিরোধিতা করে জাতীয় সংসদে মন্ত্রিসভার কোনো কোনো সদস্যও অর্থমন্ত্রীর সমালোচনে করে বক্তব্য দিয়েছেন।

আওয়ামী লীগ ও সরকারের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, অর্থমন্ত্রীর ব্যাপারে সরকার ও দলের বিভিন্ন পর্যায়ে অস্বস্তি আছে। কিন্তু সরকারপ্রধানের আস্থার কারণে অন্যরা তাঁকে এত দিন বিব্রত করেননি। কিন্তু এখন অর্থমন্ত্রীর ব্যাপারে সরকারের উচ্চপর্যায়ের সহানুভূতি আগের পর্যায়ে নেই বলে কেউ কেউ মনে করছেন। এ জন্য আগবাড়িয়ে ‘জনস্বার্থে’ অর্থমন্ত্রীর সমালোচনায় নেমেছেন আওয়ামী লীগের নেতাদের একটি অংশ।

এ সময়ে মন্ত্রী ও সাংসদেরা কেন অর্থমন্ত্রীর বিরুদ্ধে সংসদে এত কথা বলছেন—এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘রাজনৈতিক বিষয়ে আমি মন্তব্য করতে চাই না। হয়তো আগে তাঁরা বিষয়গুলো ভালো করে পড়েননি। এখন যখন চারদিকে সমালোচনা হচ্ছে, তাতে তাঁরাও যোগ দিচ্ছেন। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তো প্রধানমন্ত্রী দেবেন। আমরা অপেক্ষা করি।’

প্রসঙ্গ বেসিক ব্যাংক

গতকাল সংসদে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ বেসিক ব্যাংক প্রসঙ্গেও কথা বলেছেন। ব্যাংক খাতে লুটপাটের অভিযোগ এনে মাহবুব উল আলম হানিফ বলেন, ‘বেসিক ব্যাংককে এক হাজার কোটি টাকা মূলধন দেওয়া হচ্ছে। কার টাকা কেন দিচ্ছেন? তারা দুর্নীতির জন্য লুটপাট করবে আর মূলধন দিতে হবে আমাদের? প্রয়োজনে এই ব্যাংকগুলোর বিষয়ে নতুন করে চিন্তা করা হোক। সরকারি টাকা এভাবে লুটপাট করতে দেওয়া যাবে না।’

এ প্রসঙ্গে অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, অর্থমন্ত্রী নিজেই জাতীয় সংসদে ২০১৫ সালের ৩০ জুন বাজেট পাসের দিন সোনালী ব্যাংকের হল-মার্ক ও বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারির জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা কেন নিতে পারছিলেন না তা বলছিলেন। অর্থমন্ত্রী ওই দিন বলেছিলেন, ‘নিজেদের লোকের কারণে ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না।’

তিন নেতার তোপ

প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসের পরও ব্যাংক হিসাবে আবগারি শুল্ক বাড়ানোর বিষয়ে অনড় থাকায় অর্থমন্ত্রীর উদ্দেশে ফজলুল করিম সেলিম বলেন, ‘আপনার দায়িত্ব বাজেট পেশ করা। এই সংসদের ৩৫০ জন জনগণের প্রতিনিধি ঠিক করবেন জনগণের কল্যাণে কোনটা থাকবে, কোনটা থাকবে না। আপনি একগুঁয়েমি সিস্টেম বন্ধ করেন, কথা কম বলেন।’

সেলিম বলেন, অর্থমন্ত্রীর কিছু কথাবার্তায় সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়। আগেও তিনি অর্থমন্ত্রীকে কথা কম বলার পরামর্শ দিয়েছেন জানিয়ে সেলিম বলেন, ‘আপনার বয়স হয়ে গেছে। কখন কী বলে ফেলেন ঠিক থাকে না।’

ব্যাংক হিসাবে আবগারি শুল্ক বাড়ানোর প্রস্তাবের সমালোচনা করে সেলিম বলেন, এই সামান্য টাকার জন্য গোটা জাতির কাছে আওয়ামী লীগ সম্পর্কে খারাপ ধারণা তৈরি হবে।

মাহবুব উল আলম হানিফ বলেন, বাজেট নিয়ে সারা দেশে আলোচনার ঝড় চলছে। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, এটা নির্বাচনী বাজেট নয়। তাহলে অর্থমন্ত্রী কবে নির্বাচনী বাজেট দেবেন? তিনি বলেন, আগামী বাজেট কার্যকর হবে জুলাইয়ে। তখন বর্ষা শুরু হবে। সেপ্টেম্বরে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় গেলে অক্টোবরে নির্বচনের তফসিল। এবারই নির্বাচনমুখী বাজেট করা উচিত ছিল। বলা যায় অর্থমন্ত্রী এবার নির্বাচন বিরোধী বাজেট করেছেন।

১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রস্তাবের বিরোধিতা করে সরকার দলের এই সদস্য বলেন, অর্থমন্ত্রী ভ্যাট আরোপ করেছেন গণহারে। পৃথিবীর ইতিহাসে এক বছরে ৩০ শতাংশ বাড়তি ভ্যাট আহরণের নজির নেই। এটা যৌক্তিক নয়।

সাবেক তথ্যমন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ ব্যাংক হিসাবে বাড়তি আবগারি শুল্ক প্রত্যাহারের দাবি করে বলেন, এমনিতে সুদ কম। এর ওপর শুল্ক বাড়ালে তা হবে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। সঞ্চয়পত্রে সুদের হার না কমানোর দাবি জানিয়ে আবুল কালাম বলেন, ১০ শতাংশ বাড়ালে খরচ হবে এক হাজার কোটি টাকা। কিন্তু উপকার পাবে লাখ লাখ মানুষ। এটা সিনিয়র সিটিজেনরা পান। তাঁরা কোথাও হাত পাততে পারেন না। অর্থমন্ত্রীর উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘ঋণখেলাপিদের বিশাল লিস্ট দিছেন। কই তাদের তো ধরতে পারেন না। ব্যাংকের টাকা পাচার বন্ধ করতে পারছেন না। আর নিম্ন মধ্যবিত্তের ওপর কর চাপিয়ে দিচ্ছেন।’

এই তিন নেতা ছাড়াও সংসদে অর্থমন্ত্রী ও বাজেট নিয়ে আরও সাতজন সাংসদ বক্তব্য দেন। জাতীয় পার্টির সাংসদ সেলিমউদ্দিন বলেন, ব্যাংক খাতে লুটপাট হয়েছে। আগেরবার অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন সাগরচুরি হয়েছে। বাস্তবে চুরি হয়েছে মহাসাগর। এ ছাড়া হয়েছে ডিজিটাল ডাকাতি।

আওয়ামী লীগের সাংসদ এইচ এম আশিকুর রহমান বলেন, ভ্যাট, আবগারি শুল্ক ও সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমানোর ঘোষণার নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দৃশ্যমান। অর্থমন্ত্রী জটিল পরিস্থিতি সামলাচ্ছেন।

বিরোধী দল জাতীয় পার্টির সাংসদ মাহজাবীন মোর্শেদ বিদ্যুৎ বিলে ভ্যাট না বসানো, ব্যাংক হিসাবে আবগারি শুল্ক না বাড়ানো এবং গ্যাসের দাম না বাড়ানোর দাবি জানান।

তবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে বলেন, অর্থমন্ত্রী মানুষের কথা শোনেন। তিনি সংসদে ও বাইরে মানুষের কথা শুনেছেন। প্রস্তাবিত বাজেটে যতটুকু পরিবর্তন-পরিমার্জন দরকার, তা করে বাজেট পাস হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.