চলতি অর্থবছর শেষে সরকারের প্রচ্ছন্ন দায় দাঁড়াবে ৬০ হাজার কোটি টাকা। ৩০ জুনের পরও এ দায় কার্যকর থাকবে। প্রচ্ছন্ন দায় প্রকৃত দায় নয়, তবে যেকোনো সময় দায়ে পরিণত হতে পারে।

খরচ মেটাতে সরকার যেমন বাজেটের ২৫ শতাংশই দেশি-বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নিয়ে থাকে, সরকারি মালিকানাধীন আর্থিক ও অ-আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও নিজেদের চলার জন্য ঋণ নিতে হয়। এর ফলে সরকারের ওপর সম্ভাব্য যে দায়ের সৃষ্টি হয়, সরকারের মতে সেটাই হচ্ছে ‘প্রচ্ছন্ন দায়’।

মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতিতে বলা হয়, ক্রমবর্ধমান বিনিয়োগ চাহিদা মেটাতে প্রবৃদ্ধি সঞ্চারি বিদ্যুৎ, জ্বালানি, কৃষি, বেসামরিক বিমান চলাচল ইত্যাদি খাতের ঋণের বিপরীতে সরকার গ্যারান্টি (নিশ্চয়তা) বা কাউন্টার গ্যারান্টি দেয়।

১ জুন পেশ হওয়া বাজেটের সংক্ষিপ্তসারে বলা হয়েছে, ‘এসব ঋণের অর্থ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো সময়মতো পরিশোধে ব্যর্থ হলে তা পরিশোধের দায়দায়িত্ব সরকারের ওপর বর্তায়। সরকারের ভবিষ্যৎ আর্থিক অবস্থার ওপর এর (প্রচ্ছন্ন দায়) প্রভাব রয়েছে।’

অনেক ক্ষেত্রে ঋণদাতা সংস্থাগুলো ঋণ গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশ্বাস করতে চায় না বলেই সরকারকে নিশ্চয়তাগুলো দিতে হয়। সরকারি অর্থ ও বাজেট ব্যবস্থাপনা আইন, ২০০৯-এ অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগকে এই নিশ্চয়তা দেওয়ার এখতিয়ার দিয়েছে। তবে নিশ্চয়তা দেওয়ার আগে সরকারি নীতি ও কর্মসূচি বাস্তবায়নের কথা বিবেচনা করা হয় বলে জানান অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা।

সদ্য প্রস্তাবিত বাজেট বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রচ্ছন্ন দায়ের হার গতবারের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে বেড়ে এবার ২ দশমিক ৭ শতাংশ হয়েছে। বাজেটের মোট আকারের তা ১৫ শতাংশ। প্রচ্ছন্ন দায়ের ৬০ দশমিক ৮ শতাংশ আবার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের। এ ছাড়া কৃষি খাতে ১৫ দশমিক ৩ শতাংশ এবং বাংলাদেশ বিমানের অনুকূলে রয়েছে ১০ দশমিক ৯ শতাংশ।

প্রচ্ছন্ন দায়ের পরিমাণটা বেশি বলে মনে করেন বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘ঋণ গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ পাওয়ার যেমন যোগ্যতা নেই, ঋণ পরিশোধেরও ক্ষমতা নেই। নিশ্চয়তা দেওয়ার আগে তাই সরকারের উচিত হবে ঋণ গ্রহণকারী সংস্থাগুলোর ব্যবস্থাপনাগত দক্ষতা উন্নয়নের শর্ত দেওয়া এবং করুণ অবস্থার ব্যবচ্ছেদ করা। আমার প্রশ্ন, নিশ্চয়তা দিয়ে দিয়ে কি প্রচ্ছন্ন দায়ের আকার সরকার বাড়াতেই থাকবে?’

ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতার চিত্র তেমন নেই বলে সরকার বলে থাকে—এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাহিদ হোসেন বলেন, ‘এখানেও একটা ফাঁকি আছে। ভর্তুকির নামে যে টাকা দেওয়া হয়, তা কিন্তু ব্যয় হয় ঋণের টাকা পরিশোধে।’

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি

বাজেটের তথ্য অনুযায়ী, ৩০ জুন ১৭টি প্রকল্পের বিপরীতে বিদ্যুৎ খাতে সরকারের নিশ্চয়তা দাঁড়াবে ৩৬ হাজার ৪১১ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। আগেরবারের ১৪ হাজার ৪৬৬ কোটি টাকা থেকে তা প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা বেশি।

এদিকে জ্বালানি খাতে নিশ্চয়তা এবার একটি, পরিমাণ মাত্র ৪০০ কোটি টাকা। তেল আমদানির জন্য বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন বিদেশি একটি সংস্থা থেকে ঋণ নিয়েছে, তার বিপরীতেই এ নিশ্চয়তা। অথচ আগেরবারই জ্বালানি খাতে নিশ্চয়তা ছিল ২৩ হাজার ৮৬০ কোটি টাকা।

কৃষি ও বিমান

কৃষি খাতে সরকারের নিশ্চয়তা ৯ হাজার ১৫৫ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক যে কৃষি ঋণ দিয়ে থাকে, তার বিপরীতে সরকারের এই নিশ্চয়তা।

এদিকে বাংলাদেশ বিমানের জন্য কয়েক বছর ধরে ৬ হাজার কোটি টাকার মতো নিশ্চয়তা দিয়ে আসছে সরকার। এবার নতুন করে বিমানের জন্য সোনালী ব্যাংককে (ইউকে) ১ হাজার ৮৮ কোটি ৪০ লাখ টাকার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে।

ডিসি-১০ কেনার অর্থ পরিশোধের ব্যর্থতায় ১৯৮৭ সালে একবার সরকারকে বিমানের জন্য ৬ কোটি ৪০ লাখ ডলার পরিশোধ করতে হয়েছিল।

টেলিযোগাযোগ ও বিবিধ

টেলিযোগাযোগ খাতে জেলা পর্যায়ে ডিজিটাল টেলিফোন স্থাপন এবং বাংলাদেশ সাবমেরিন কেব্‌ল কোম্পানির জন্য দুটি প্রতিষ্ঠানকে ২ হাজার ১০০ কোটি টাকার নিশ্চয়তা দেওয়া আছে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ প্রকল্পের জন্য এইচএসবিসিকে দেওয়া হয়েছে ১ হাজার ৩৪৪ কোটি টাকার নিশ্চয়তা।

বিবিধ খাতের মধ্যে বাংলাদেশ পাটকল সংস্থা, চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন, আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংক, ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের ঋণের বিপরীতে সরকার নিশ্চয়তা দিয়ে থাকে সাধারণত বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সোনালী, অগ্রণী, জনতা ও রূপালী ব্যাংককে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.