উত্তেজনা বাড়ছে উত্তর কোরিয়া এবং আমেরিকার মধ্যে

ডেস্ক: ক্রমশ উত্তেজনা বাড়ছে উত্তর কোরিয়া এবং আমেরিকার মধ্যে। রীতিমত একে-অপরকে পরমাণু হামলার হুঁশিয়ারি দিয়ে যাচ্ছে। এই অবস্থায় চরম আশঙ্কার কথা প্রকাশ করলেন মার্কিন রিপাবলিকান দলের সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম। তার মতে, এই বছর অর্থাৎ ২০১৮ সালেই উত্তর কোরিয়া এবং আমেরিকার মধ্যে সম্পর্ক বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে মোড় নিতে চলেছে।
মার্কিন টেলিভিশন সিবিএসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে গ্রাহাম বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উচিত উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া। উত্তর কোরিয়ার উপর চাপ বাড়ানোর ক্ষেত্রে এটাই বড় সিদ্ধান্ত হবে বলে মনে করেন তিনি।
তিনি শঙ্কা প্রকাশ করেন, উত্তর কোরিয়া তার সপ্তম পরমাণু বোমার পরীক্ষা চালালে ৭০ ভাগ সম্ভাবনা রয়েছে যে আগামী ১২ মাসের মধ্যে ওয়াশিংটন, পিয়ংইয়ংয়ের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা নেবে। ফলে, পরমাণু কর্মসূচি থেকে উত্তর কোরিয়াকে বিরত রাখতে পিয়ংইয়ংয়ের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করার মতো একটি মাত্র পথই খোলা রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন সিনেটর গ্রাহাম।
গ্রাহম বলেন, ২০১৮ সাল হতে যাচ্ছে মার্কিন ভূখণ্ডে আঘাত হানার উত্তর কোরিয়ার সক্ষমতাকে ধ্বংস করে দেওয়ার বছর। উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে উপযুক্ত সামরিক ব্যবস্থা না নেওয়া হলে কেবল নিষেধাজ্ঞা দিয়ে কোনও কাজ হবে না বলেও সতর্ক করেন তিনি।

বিজেপির গুজরাট ও হিমাচল জয়

টানা ২২ বছর ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও ষষ্ঠবারের মতো গুজরাট শাসনের অধিকার অর্জন করল বিজেপি। একই সঙ্গে তারা কংগ্রেসকে ক্ষমতাচ্যুত করল উত্তর ভারতের পাহাড়ি রাজ্য হিমাচল প্রদেশে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাফল্যের পাগড়িতে এই দুই জয় নিঃসন্দেহে দুটি ঝলমলে পালক।

সোমবার সকাল থেকে এই দুই রাজ্যের ফল গণনা শুরু হয়। বেলা যত এগোয়, বিজেপির জয় ততই নিশ্চিত হয়ে যায়। গুজরাটে মোট ১৮২ আসনের মধ্যে বিজেপি ১০৪ আসনে এগিয়ে, কংগ্রেস এগিয়ে ৭৫টিতে। তিন কেন্দ্রে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জয়ের সম্ভাবনা।

হিমাচল প্রদেশে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর সরকারের পরিবর্তন ঘটে। এবারও তার ব্যতিক্রম ঘটছে না। ৬৮ আসনবিশিষ্ট বিধানসভায় বিজেপি ৪৫ আসনে এগিয়ে, কংগ্রেস ১৯টিতে। হিমাচল হারানোর ফলে দেশে কংগ্রেস শাসিত রাজ্যের সংখ্যা দাঁড়াল ৪-এ। কর্ণাটক, পাঞ্জাব, মেঘালয় ও মিজোরাম। পাঞ্জাব ছাড়া বাকি তিন রাজ্যে আগামী বছর ভোট। দেশকে কংগ্রেস-মুক্ত করার যে ডাক নরেন্দ্র মোদি দিয়েছেন, তা ব্যর্থ করাই কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধীর কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

হিমাচলে যে পালাবদল ঘটতে চলেছে, সে বিষয়ে কারও মনে বিশেষ সন্দেহ বা সংশয় ছিল না। কিন্তু আগ্রহ ছিল গুজরাট নিয়ে। আগ্রহের কারণ একাধিক। নরেন্দ্র মোদি গুজরাটের মানুষ। মুখ্যমন্ত্রিত্ব ছেড়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হন ২০১৪ সালে। বিজেপি সভাপতি অমিত শাহও গুজরাটি। এই প্রথম গুজরাটে ভোট হচ্ছে যখন রাজ্য ও কেন্দ্র দুই জায়গাতেই বিজেপি ক্ষমতায়। কাজেই গুজরাটে জেতা-হারার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল প্রধানমন্ত্রী ও দল সভাপতির সম্মান।

একই রকম সম্মানের প্রশ্ন ছিল কংগ্রেসের কাছেও। ২২ বছর ওই রাজ্যে কংগ্রেস ক্ষমতার বাইরে। রাহুল তাই কোমর কষে নেমেছিলেন বিজেপিকে ক্ষমতাচ্যুত করতে। গত চার মাস ধরে তিনি রাজ্য চষে বেড়িয়েছেন। ক্ষুব্ধ পাতিদার নেতা হার্দিক প্যাটেলের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন। দলে নিয়েছেন অনগ্রসর নেতা অল্পেশ ঠাকোরকে। সমর্থন করেছেন দলিত নেতা জিঘ্নেশ মেওয়ানিকে। জাতপাতের এই সমীকরণ হাতিয়ার করে রাহুল চেয়েছিলেন বিজেপির কাছ থেকে ক্ষমতা ছিনিয়ে নিতে। কিন্তু লক্ষ্যের অনেক কাছে এগিয়েও শেষ পর্যন্ত কংগ্রেসকে পিছিয়ে পড়তে হলো।

বিজেপি গুজরাট দখলে রাখতে পারলেও এবারের ভোটে তাদের রমরমা ও জৌলুশ অনেকটাই ম্লান। অমিত শাহ কম করে ১৫০ আসন জেতার দাবি জানিয়েছিলেন। কিন্তু দেড় শ তো দূরের কথা, গতবারের জেতা আসনগুলোও তারা ধরে রাখতে পারেনি। ২০১২ সালে বিজেপি জিতেছিল ১১৫ আসন। এবার নিশ্চিতভাবেই তার চেয়ে অনেক কম পাচ্ছে। তুলনায় গতবারের চেয়ে কংগ্রেস তাদের আসনসংখ্যা বাড়াতে চলেছে। গতবার ছিল ৬১, এবার ৮০র মতো। প্রাপ্ত ভোটের হার বেড়েছে দুই দলেই। বিজেপি পেতে চলেছে ৪৯ শতাংশ ভোট, কংগ্রেস প্রায় ৪২ শতাংশ। কিন্তু কমে গেছে বিজেপির জয়ের মার্জিন। এসব বিবেচনা করলে দেখা যাচ্ছে, ক্ষমতা ধরে রাখলেও এই ভোট বিজেপি রাজ্য নেতৃত্বের কাছে অনেকগুলো প্রশ্ন রেখে দিচ্ছে।

এবারের ভোট ছিল গুজরাটের গ্রাম বনাম শহরের লড়াই। সেদিক থেকে দেখলে গ্রামীণ গুজরাটে কংগ্রেস তাদের প্রাধান্য বিস্তার করেছে। বিজেপি ভালো করেছে শহর ও আধা শহরে। গ্রামীণ পাতিদারেরা কংগ্রেসকে যেমন ঢালাও ভোট দিয়েছে, শহুরে প্যাটেলরা তেমন ঝুলি ভরিয়েছে বিজেপির।

বিজেপি লড়াইটা শুরু করেছিল প্রগতি ও উন্নয়নকে হাতিয়ার করে। কিন্তু ভোট যত এগিয়েছে, বিজেপি ততই বড় করে তুলে ধরেছে হিন্দুত্বকে। প্রশ্ন করতে শুরু করে রাহুলের মন্দির পরিক্রমাকে। ভোটের একেবারে শেষ পর্বে তারা সাম্প্রদায়িকতা ও পাকিস্তানকে বড় করে তুলে ধরে। পাশাপাশি টেনে আনে গুজরাটি অস্মিতা বা জাত্যভিমানকে।

গুজরাটের ফল কংগ্রেসের কাছে যথেষ্ট আশাব্যঞ্জক। কিন্তু রাহুলের কাছে আগামী দিনের লড়াই আরও কঠিন। আগামী বছরের গোড়ায় মেঘালয় ও মিজোরামে ভোট। এই দুই রাজ্য কংগ্রেসের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে নরেন্দ্র মোদি নতুন উদ্যমে নামছেন। বিজেপি নজর দিয়েছে কর্ণাটকেও। কংগ্রেসের হাত থেকে রাজ্যটি দখল করতে তারা মরিয়া। আগামী বছর কর্ণাটকের সঙ্গে মধ্য প্রদেশ ও রাজস্থানেও ভোট। এই দুই রাজ্যে বিজেপির প্রতিদ্বন্দ্বী কংগ্রেসই। সারা দেশে কৃষক অসন্তোষকে কংগ্রেস যেভাবে বড় করে তুলে ধরেছে, তাতে মধ্য প্রদেশ ও রাজস্থানে বিজেপি বিশেষ স্বস্তিতে নেই।

বিজেপি গুজরাট জিততে চলেছে ঠিকই, কিন্তু এই জয় তাদের অবশ্যই আনন্দে উদ্বেলিত করবে না। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা এই ফলকে বিজেপির নৈতিক পরাজয়েরই শামিল বলে মনে করছেন।

রাহুলের নামে দুধ, চা, পেঁয়াজ

৩০ বছর বয়সী আনোয়ার হোসেনের বাড়ি ভারতের উত্তর প্রদেশের গোরক্ষপুরে। উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) যোগী আদিত্যনাথের ঘাঁটি গোরক্ষপুর। তবে রাহুল গান্ধীর ভক্ত আনোয়ার।

২০০৫ সালে আনোয়ার ছিলেন ছাত্র। সে সময় গোরক্ষপুরের যুব কংগ্রেস আয়োজিত একটি সভায় যোগ দিতে এসেছিলেন রাহুল গান্ধী। ওই জনসভায় রাহুল গান্ধীর ভাষণ শুনে অভিভূত হয়েছিলেন আনোয়ার। এরপরে ধীরে ধীরে কংগ্রেসের প্রতি অনুরক্ত হন। প্রথমে কংগ্রেসের ছাত্রসংগঠন ছাত্র পরিষদ, তারপর যুব কংগ্রেস এবং শেষে কংগ্রেসে যোগ দেন।

আনোয়ার রাহুল গান্ধীর আদর্শে চলেন। দেখাও করেছেন রাহুল গান্ধীর সঙ্গে। শুরু করেছেন, কংগ্রেসের জন্য নবীন সদস্য সংগ্রহের কাজ। আনোয়ার এখন গোরক্ষপুরের কংগ্রেস কমিটির সম্পাদক।

সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ২০১৪ সালে ভারতের লোকসভা নির্বাচনী প্রচারে নরেন্দ্র মোদির চা ছিল আলোচনায়। ‘চাওয়ালা মোদি’ হিসেবে প্রচার চলে তাঁর। ওই নির্বাচনে বসে থাকেননি আনোয়ারও। এলাকায় বিনা মূল্যে দুধ বিতরণ শুরু করেন। নাম দেন ‘রাহুল দুধ’।

শুধু কি তা–ই? ২০১৫ সালে আনোয়ার রাহুল গান্ধীকে কংগ্রেসের সভাপতি করার জন্য নিজের রক্ত দিয়ে আবেদন লিখে পাঠান কংগ্রেস হাইকমান্ডে। এই খবর তখন গোটা দেশে সাড়া ফেলেছিল। গত বছর নভেম্বরে নোট বাতিলের পর মানুষ যখন টাকার জন্য ব্যাংকে লাইন দিয়েছিল, তখন আনোয়ার লাইনে লাইনে ঘুরে বিনা পয়সায় চা খাইয়েছিলেন। সেই চায়ের নামও ছিল ‘রাহুল হারবাল চা’। পেঁয়াজের দাম যখন বেড়ে গেল, তখন প্রতি কেজি পেঁয়াজ পাঁচ রুপিতে বিক্রি করেন আনোয়ার। আর সেই পেঁয়াজের নাম দেন ‘রাহুল পেঁয়াজ’। উত্তর প্রদেশের বিধানসভা নির্বাচনের সময় ভোটারদের হাতে আনোয়ার তুলে দিয়েছিলেন গোলাপ। নাম দিয়েছিলেন ‘রাহুল গোলাপ’।

নিজের বাড়িও সাজিয়েছেন রাহুলের ছবি দিয়ে। বাড়িতেই গড়েছেন রাহুলের ছবির গ্যালারি। এমনকি চা-কফি পানের মগেও দিয়েছেন রাহুল গান্ধীর ছবি। আনোয়ারের শয়নে–স্বপনে শুধু রাহুল গান্ধী।

আনোয়ারের প্রিয় সেই রাহুল গান্ধী কংগ্রেসের সভাপতি পদে গত শনিবার নির্বাচিত হয়েছেন। তাই আনোয়ারের আনন্দের সীমা নেই। এবার আনোয়ার নতুন কিছু করবেন। কিন্তু সেটা কী, তা এখনো জানাননি।